আল-জাজিরা
সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শুক্রবার তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটি ‘অবিলম্বে’ কার্যকর হবে। কারণ হিসেবে তিন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশের অভিযোগ করেন তিনি। তবে কীভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে তখন বিস্তারিত জানানো হয়নি। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরা হোয়াইট হাউসে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিলেন।
ঘোষণার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কি নিজের অপছন্দের সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউস থেকে ইচ্ছামতো নিষিদ্ধ করতে পারেন?
এর সরল উত্তর নেই। প্রেসিডেন্ট ও হোয়াইট হাউসের কাছে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের কিছু ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অপছন্দ হওয়ার কারণে তাকে আলাদাভাবে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এবং আদালতের দীর্ঘদিনের নজিরের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে। ১৯৭৭ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ফেডারেল আপিল আদালত বলেছিলেন, হোয়াইট হাউসের প্রেস পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো বা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুভিত্তিক মানদণ্ড ব্যবহার করা যায় না।

কাদের নিষিদ্ধ করেছেন ট্রাম্প
ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, সিএনএন, এমএস নাও—যা আগে এমএসএনবিসি নামে পরিচিত ছিল—এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানগুলো তার প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নিয়মিত ‘কল্পকাহিনি ও মিথ্যা’ প্রকাশ করছে। তবে ওই পোস্টে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদনকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেননি।
পরে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচক সংবাদ’ প্রকাশ করে এবং রিপাবলিকান পার্টি ও তার প্রশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। একই সময় তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্টেরও সমালোচনা করেন এবং আরও সংবাদমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।
সিএনএন ও পলিটিকোর প্রতিক্রিয়া
সিএনএন ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা নিজেদের হোয়াইট হাউস সাংবাদিক এবং তাদের প্রতিবেদনের পাশে রয়েছে।
সিএনএনের বক্তব্য হলো, মার্কিন সংবিধানের অধীনে সরকারি বাধা বা হস্তক্ষেপ ছাড়া সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করার অধিকার তাদের রয়েছে। নিষেধাজ্ঞাটি বাস্তবে কার্যকর হলে সেটিকে তারা সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বেআইনি আঘাত হিসেবে দেখবে।
পলিটিকোও জানিয়েছে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের হোয়াইট হাউস সম্পর্কে তারা স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখবে এবং প্রথম সংশোধনীর অধিকার সীমিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনও তিন সংবাদমাধ্যমের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ করেন কি না, তার ওপর সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক সুরক্ষা নির্ভর করে না।
ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মার্ক শোয়েফ জুনিয়র বলেছেন, সরকারের অপছন্দের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হলে সেটি প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কারা সংবাদ সংগ্রহ করতে পারবেন, তা সরকার নিজেই নির্ধারণ করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হবে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের অধিকার কতটুকু?
মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সরকারকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করার আইন তৈরিতে বাধা দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক সাংবাদিকের হোয়াইট হাউসের প্রতিটি কক্ষ, বৈঠক কিংবা প্রেসিডেন্টের প্রতিটি অনুষ্ঠানে প্রবেশের স্বয়ংক্রিয় সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
হোয়াইট হাউস নিরাপত্তা, স্থানসংকট এবং প্রেসিডেন্টের সময়সূচির মতো কারণে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রেসিডেন্টও নিজের সাক্ষাৎকারের জন্য নির্দিষ্ট সাংবাদিক বেছে নিতে পারেন।
কিন্তু একবার সরকার স্বীকৃত সাংবাদিকদের জন্য প্রেস পাস ও সংবাদ সংগ্রহের একটি কাঠামো তৈরি করলে, সেই ব্যবস্থার মধ্যে কাউকে শুধু তার প্রকাশিত বক্তব্য বা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর কারণে ইচ্ছামতো বাদ দেওয়া নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়।
এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ১৯৭৭ সালের শেরিল বনাম নাইট মামলা।
ডিসি সার্কিটের আপিল আদালত ওই মামলায় বলেছিলেন, হোয়াইট হাউস প্রেস পাস প্রত্যাখ্যান করলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে কারণ জানানো, অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং লিখিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছিলেন, সংবাদমাধ্যমের বক্তব্যের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে নির্বিচারে প্রেস পাস দেওয়া বা বাতিল করা প্রথম সংশোধনীর উদ্বেগ তৈরি করে।
জিম অ্যাকোস্টার ঘটনায় কী হয়েছিল
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও প্রায় একই ধরনের বিরোধ দেখা দিয়েছিল।
২০১৮ সালে হোয়াইট হাউস সিএনএনের প্রধান হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক জিম অ্যাকোস্টার প্রেস পাস প্রত্যাহার করে। সিএনএন ও অ্যাকোস্টা আদালতে মামলা করেন এবং প্রথম ও পঞ্চম সংশোধনীর অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
একজন ফেডারেল বিচারক সাময়িকভাবে অ্যাকোস্টার পাস পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই প্রাথমিক আদেশটি মূলত যথাযথ প্রক্রিয়া বা ‘ডিউ প্রসেস’ না মানার প্রশ্নে দেওয়া হয়েছিল; তখনই আদালত সিএনএনের সব প্রথম সংশোধনী-সংক্রান্ত দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেননি।
তারপর হোয়াইট হাউস প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের আচরণ নিয়ে নতুন নিয়ম তৈরি করে এবং অ্যাকোস্টার পাস স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে দেয়।
এই নজির দেখায়, হোয়াইট হাউস সাংবাদিকদের জন্য নিয়ম করতে পারে, কিন্তু সেই নিয়ম কীভাবে তৈরি ও প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটিও আদালতের পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।

এপির সঙ্গে ট্রাম্পের আরেক আইনি লড়াই
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলমান মামলাটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ঘিরে।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ‘গালফ অব মেক্সিকো’র পরিবর্তে ‘গালফ অব আমেরিকা’ নাম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এপি জানায়, তারা ট্রাম্পের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পাঠকের কথা বিবেচনা করে প্রচলিত ‘গালফ অব মেক্সিকো’ নাম ব্যবহারও চালিয়ে যাবে।
এরপর এপির সাংবাদিকদের ওভাল অফিস, এয়ার ফোর্স ওয়ান এবং সীমিত জায়গার কিছু প্রেসিডেন্টীয় অনুষ্ঠানে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়। এপি এর বিরুদ্ধে মামলা করে।
একটি নিম্ন আদালত প্রথমে সিদ্ধান্ত দেয় যে, এপিকে তাদের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের কারণে শাস্তি দেওয়া প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে আপিল আদালত সেই আদেশ কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে মামলা চলাকালে হোয়াইট হাউসের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের বর্তমান ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও মামলাটি চলমান বলে এপি জানিয়েছে।
এ কারণে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকো নিয়ে নতুন বিরোধ আদালতে গেলে তার ফলাফল আগে থেকেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তাহলে ট্রাম্প কি নিষিদ্ধ করতে পারবেন?
প্রেসিডেন্টের হাতে হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার পরিচালনার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়।
সরকার যদি কোনো নিরপেক্ষ নিরাপত্তা নীতি, স্থানসংকট বা সাধারণভাবে প্রযোজ্য প্রেস নীতির ভিত্তিতে প্রবেশ সীমিত করে, তাহলে আইনি অবস্থান এক রকম হতে পারে।
অন্যদিকে কোনো সংবাদমাধ্যমকে তার সমালোচনামূলক বা অপছন্দের প্রতিবেদনের কারণেই আলাদা করে বাদ দেওয়া হলে বিষয়টি ‘ভিউপয়েন্ট ডিসক্রিমিনেশন’ বা মতামতভিত্তিক বৈষম্য হিসেবে আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। শেরিল মামলাসহ পুরোনো নজির এই ধরনের সরকারি পদক্ষেপের ওপর সাংবিধানিক সীমা আরোপ করে।
আর বর্তমান ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ট্রাম্প নিজেই ‘ফেক নিউজ’ ও নেতিবাচক প্রতিবেদনের কথা বলে নিষেধাজ্ঞার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে ভবিষ্যৎ মামলায় সরকারের উদ্দেশ্য কী ছিল, সেই প্রশ্নটিও গুরুত্ব পেতে পারে।

এর আগেও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাতে ট্রাম্প
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের একাধিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। এপির প্রবেশাধিকার সীমিত করার পাশাপাশি পেন্টাগনের সাংবাদিকদের চলাচল নিয়েও নতুন নিয়ম করা হয়েছে, যা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছেন বা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
তবে কোনো সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং তাকে সরকারি সংবাদ সংগ্রহের কাঠামো থেকে শুধুমাত্র প্রতিবেদনের কারণে বাদ দেওয়া আইনগতভাবে একই বিষয় নয়। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে প্রথম সংশোধনীর প্রশ্ন আরও সরাসরি সামনে আসে।
এবারও কি আদালতে যাবে বিষয়টি?
সিএনএন ও পলিটিকো জানিয়েছে, তারা নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করবে। তবে শনিবার পর্যন্ত নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
আর ট্রাম্প শুক্রবার নিষেধাজ্ঞা ‘অবিলম্বে’ কার্যকর বলে ঘোষণা করলেও সেদিন বিকেল পর্যন্ত তিন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকেরা হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে অবস্থান করছিলেন। ফলে প্রশাসন বাস্তবে নিষেধাজ্ঞাটি কীভাবে প্রয়োগ করে, সেটিও পরবর্তী আইনি পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
শেষ পর্যন্ত এই বিরোধ আদালতে গেলে প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্প কোন সাংবাদিককে পছন্দ করেন বা করেন না—সেটি হবে না। আদালতকে বিবেচনা করতে হতে পারে, রাষ্ট্রপতির সংবাদমাধ্যমে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের বৈধ ক্ষমতা এবং সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের কারণে প্রতিশোধ নেওয়া থেকে প্রথম সংশোধনী যে সুরক্ষা দেয়—এই দুইয়ের সীমারেখা ঠিক কোথায়।

