মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি ও সার আমদানিতে গত সাত মাসে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি মার্কিন ডলার। বাড়তি এই ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে ইউরোপের তিন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি—জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে দেশ তিনটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি জানান, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এ চাপ মোকাবিলা করা কঠিন। এ পরিস্থিতিতে বাড়তি আমদানি ব্যয়ের বোঝা সামলাতে তিন দেশের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে চাওয়া ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণের শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহের শুরুতে ঢাকায় আসার কথা সংস্থাটির প্রতিনিধিদলের।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণের শর্তগুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে দুই পক্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি সরবরাহে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরকারি ভর্তুকির হিসাবেও।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ছয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি পরিবহনের ভাড়া প্রতি ব্যারেলে ৩ থেকে ৪ ডলার থেকে বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে উঠেছে।
সারের বাজারেও পরিস্থিতি অস্থির। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রতি টনে প্রায় ৪২২ ডলার থেকে বেড়ে একপর্যায়ে ৮৫০ ডলারে পৌঁছেছিল। এতে সার আমদানির ব্যয় বেড়েছে। কৃষকদের জন্য সারের দাম সহনীয় রাখতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে সরকার আগেই জানিয়েছিল। ফলে সরকারি বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির একাধিক খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানির ব্যয় বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচও বাড়ে। অন্যদিকে, সারের দাম বেড়ে গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদনের ব্যয় সহনীয় রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কর্মসংস্থানের ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।
শুক্রবার ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার মূল অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ প্রবেশ করবেন। কিন্তু একই সময়ে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে চাকরির চাহিদা ও সম্ভাব্য সুযোগের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মের সামনে এটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক তরুণের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও চাকরি মিলবে না। আবার কারও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কাজের জন্য দরকারি বিদ্যুৎ বা অবকাঠামোর অভাব থাকতে পারে।
বাঙ্গা বলেন, কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি মানুষের মর্যাদা ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগের সঙ্গে জড়িত। বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা না গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিশ্বব্যাপী সংঘাত, সরকারি অর্থের সংকট ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধির মধ্যে জ্বালানি ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের উচ্চমূল্য উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে উল্লেখ করেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট।
তাঁর মতে, আগামী ৫০ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
বাঙ্গা জানান, ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক যৌথভাবে নতুন একটি কাঠামো তৈরির কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ প্রকল্প মূল্যায়ন, নথিভুক্তকরণ, বিনিয়োগের উপযোগী করে প্রস্তুত করা এবং এক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অন্য বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তরের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করা।
তিনি সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও সার সরবরাহ সচল রাখা, ভর্তুকির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

