পণ্য ও সেবা রপ্তানির বিপরীতে রপ্তানিকারকদের জন্য সরকারের দেওয়া নগদ প্রণোদনার ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নথির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করা হলেও জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পাওনা এখনো মেটানো হয়নি।
প্রণোদনার অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় আর্থিক চাপ বাড়ছে রপ্তানিকারকদের ওপর। উৎপাদন ব্যয় সামলানো, ব্যবসার বাজেট তৈরি এবং নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁদের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের প্রতিযোগিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব দেশের রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রণোদনার অর্থও দ্রুত হাতে আসে। বিপরীতে, বাংলাদেশে অর্থ ছাড়ের সময় নির্দিষ্ট না থাকায় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক এবং সাউদার্ন নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান কাদের তুর্জো বলেন, ভারত ও ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকেরা সময়মতো প্রণোদনা পাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ পান।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে রপ্তানিকারকদের অনেক সময় দুই ঈদের কাছাকাছি সময়ে প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হয়। অথচ যে মাসের প্রণোদনা, সেই মাসেই তা পরিশোধ করা উচিত। অন্তত প্রতি মাসে প্রাপ্য অর্থের ৬০ শতাংশ ছাড় করা হলেও এই সহায়তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষ্য অনুযায়ী, পণ্য রপ্তানির পর প্রণোদনার অর্থ পেতে অনেক রপ্তানিকারককে প্রায় ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়।
প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে রপ্তানির অর্থ দেশে আসার পর সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনার আবেদন করেন। এরপর ব্যাংক আবেদনটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। যাচাই শেষে সনদ ব্যাংকে ফেরত আসে এবং পরে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের পর রপ্তানিকারক টাকা পান।
হাতেমের মতে, পণ্য পাঠানোর পর রপ্তানির অর্থ দেশে আসতেই প্রায় ছয় মাস লাগতে পারে। এরপর নথি যাচাই ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় আরও দীর্ঘ সময় চলে যায়। শুধু নথি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতেই প্রায় এক বছর লেগে যেতে পারে।
আগে কখনো কখনো অর্থ পেতে দুই বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। বর্তমানে সময় কিছুটা কমলেও দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় সমস্যা তৈরি করছে বলে জানান তিনি।
একসময় রপ্তানি প্রণোদনার বকেয়া ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল বলেও জানান হাতেম। পরবর্তী সময়ে প্রণোদনার হার কমানোর ফলে বকেয়ার পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে ১১২ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ৩২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে ৯৮ কোটি টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
এই বকেয়া অর্থ ছাড়ে বিলম্ব অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে, তাদের সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩টি রপ্তানি খাত নগদ প্রণোদনার আওতায় রয়েছে। খাতভেদে প্রণোদনার হার ০.৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত।
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত এই সুবিধার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা পান।
তবে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই ধাপে রপ্তানি প্রণোদনার হার কমানো হয়েছিল। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরিকল্পনাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর বিধিনিষেধ আসবে। এ কারণে একবারে সব সুবিধা প্রত্যাহার না করে ধাপে ধাপে কমানোর পথ বেছে নিয়েছিল সরকার, যাতে রপ্তানিকারকেরা হঠাৎ বড় ধাক্কার মুখে না পড়েন।
তবে প্রণোদনার হার কমানোর পাশাপাশি বকেয়া অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে প্রণোদনা দেওয়া গেলে নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতেও সহায়তা মিলবে।

