বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু কম খরচে বেশি পণ্য উৎপাদনের দেশ হিসেবে নয়, বরং বৈচিত্র্যময় ও উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে সক্ষম উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে হংকংয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে এইচএসবিসি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। গত ২৮ অক্টোবর হংকংয়ের আইল্যান্ড শাংরি-লা হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল রোডশো ২০২৬’ এ আন্তর্জাতিক ক্রেতা, সোর্সিং প্রতিষ্ঠান, পোশাক প্রস্তুতকারক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ১৩০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। আয়োজনে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
বিজিএমইএ ও এইচএসবিসি যৌথভাবে এবং হংকংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের সহযোগিতায় এ আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, এইচএসবিসি হংকংয়ের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান অলিভার টি জোনস এবং হংকংয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ড. শাহ মোহাম্মদ তানভীর মনসুর বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. রুবানা হক। তাঁর আলোচনায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অতীত অর্জন, পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উঠে আসে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলাচ্ছে। একসময় কম খরচে বিপুল পরিমাণ পোশাক সরবরাহ করতে পারাই ছিল বড় সুবিধা। এখন ক্রেতারা শুধু দাম বা উৎপাদনের পরিমাণ দেখছেন না। পণ্যের মান, নকশা, পরিবেশগত প্রভাব, শ্রমিকের নিরাপত্তা, সময়মতো সরবরাহ এবং কারখানার প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকেও পণ্যের ধরনে বৈচিত্র্য আনতে হচ্ছে। সাধারণ টি শার্ট, ট্রাউজার বা শার্টের পাশাপাশি কারিগরি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পোশাক, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য এবং বিশেষায়িত পোশাক তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ একই ধরনের সাধারণ পোশাক উৎপাদনে অনেক দেশ প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি ও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয় এমন পণ্যে সক্ষমতা তৈরি করতে পারলে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ থাকে। হংকংয়ের রোডশোর আলোচনায় এই বিষয়গুলোই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ থেকে কেন পণ্য সংগ্রহ করবেন’ এবং ‘ক্রেতাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ’ শীর্ষক দুটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এইচএসবিসি, বিজিএমইএ এবং আন্তর্জাতিক পোশাক ও পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন কোন ধরনের পণ্য চাইছেন, উৎপাদকদের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা কী এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে কারখানাগুলোকে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্যানেল আলোচনায় এপিক গ্রুপ, পিডিএস গ্রুপ, ডেটাডেভেলপ কনসাল্টিংয়ের পাশাপাশি এইচঅ্যান্ডএম ও কন্টুর ব্র্যান্ডসের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
রোডশোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘দ্য বাংলাদেশ কালেকটিভ’ নামে একটি বিশেষ পোশাক প্রদর্শনী। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিভিন্ন ধরন, নকশা, উদ্ভাবন এবং আধুনিক উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধু উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের সক্ষমতার কথা বলা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সরাসরি পণ্য দেখার সুযোগ দেওয়া। কারণ একজন ক্রেতা যখন কোনো দেশ থেকে পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি শুধু সরবরাহকারীর দাবি শুনেই সিদ্ধান্ত নেন না। পণ্যের মান, নকশা, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত সময়ে সরবরাহের সক্ষমতাও যাচাই করেন।
এখানে এইচএসবিসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটি শুধু ঋণ বা অর্থ লেনদেনের সেবায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং নিজস্ব আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। পোশাকশিল্পের মতো রপ্তানিনির্ভর খাতে এ ধরনের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন ক্রেতা খুঁজে পাওয়া, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং পণ্য সংগ্রহের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে ব্যবসায়ীদের শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হয় না, দরকার উপযুক্ত যোগাযোগও।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন আর শুধু বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না। উচ্চমূল্যের পণ্য, উদ্ভাবন, টেকসই উৎপাদন এবং দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও এগোচ্ছে। তাঁর মতে, পণ্যের বৈচিত্র্য ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বৈশ্বিক পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হবে।
হংকংয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ড. শাহ মোহাম্মদ তানভীর মনসুর বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, টেকসই উৎপাদনে অগ্রগতি এবং বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিজেদের মানিয়ে নেওয়া ও নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা এখন ক্রেতারা সরাসরি দেখতে ও যাচাই করতে পারছেন। পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে অগ্রগতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
তবে এ ধরনের আয়োজনের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন প্রতিনিধি অংশ নিলেন, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। রোডশোতে কোনো নির্দিষ্ট রপ্তানি আদেশ বা নতুন বিনিয়োগ চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাই এটিকে এখনই বাড়তি রপ্তানি আয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি এবং ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ।
উল্লেখ্য, গত ১২ জুলাই বিজিএমইএ ও এইচএসবিসির মধ্যে এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। হংকংয়ের এই আয়োজন সেই উদ্যোগের প্রথম বড় কার্যক্রম। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে প্রচলিত বাজারের বাইরেও নতুন ক্রেতাদের কাছে পরিচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বেশি পোশাক তৈরি করা নয়, বরং বেশি মূল্য পাওয়া যায় এমন পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এই পরিবর্তনের একটি অংশ। তবে শেষ পর্যন্ত কত নতুন ক্রেতা বাংলাদেশের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহে আগ্রহী হচ্ছেন, কত নতুন ক্রয়াদেশ আসছে এবং সেই ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে দেশীয় কারখানাগুলো কতটা সক্ষম হচ্ছে, তার ওপরই এ ধরনের আয়োজনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে।

