রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থা আরও উন্নত করা এবং দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা কমাতে মেট্রোরেল নির্মাণে বড় ধরনের বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশ নির্মাণে বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক বাংলাদেশের আগের অর্থায়ন প্রস্তাব পুনরায় পর্যালোচনা করতে সম্মত হয়েছে। প্রস্তাবিত এই ঋণ পাওয়া গেলে ৩৭১ কোটি ডলারের প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।
বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি-আমদানি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী হোয়াং কিয়ন-এর সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে ব্যাংকটি মেট্রোরেল প্রকল্পে অংশগ্রহণের বিষয়ে আগে দেওয়া আশ্বাস যাচাই করে দেখার সম্মতি জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বর্তমানে এক সপ্তাহের সফরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। গত ৩১ অক্টোবর তাঁর এ সফর শুরু হয়। সফরকালে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তিনি।
বুধবার প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০২৩ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ৩০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের কাঠামোগত চুক্তি পর্যালোচনা করেছে দুই দেশ। এ সময় অগ্রাধিকারভিত্তিক কয়েকটি প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশ, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেলকোচ সংগ্রহ।
৩৭১ কোটি ডলারের মেট্রোরেল প্রকল্প
গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩৭১ কোটি ডলারের সমান।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে মাটির নিচে এবং বাকি ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে।
পুরো পথে মোট ১৫টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি থাকবে ভূগর্ভে এবং চারটি হবে উড়াল স্টেশন।
প্রকল্পটির অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রায় ২৫০ কোটি ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ অর্থায়নকারী হিসেবে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ ১১০ কোটি ডলারের প্রস্তাবিত ঋণের বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা চাইলেও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে এত দিন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং রপ্তানি-আমদানি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বৈঠকে মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে ইতিবাচক সম্মতি পাওয়া গেছে। এখন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
যানজট কমানো ও যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা
রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং যানবাহনের চাপের কারণে প্রতিদিনই সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াত আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের ভ্রমণের সময় কমবে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোর ওপর চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই মেট্রোরেল শুধু যাতায়াতের সুবিধাই বাড়াবে না, বরং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবিত ঋণ নিশ্চিত হলে প্রকল্পটির অর্থায়ন কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। ফলে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা মোকাবিলায় মেট্রোরেল-৫ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি তৈরি হবে।

