আইসক্রিম, কেক কিংবা সুগন্ধি, ভ্যানিলার ঘ্রাণ এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু এই ঘ্রাণের পেছনের মসলাটি দেশে চাষ হতে পারে, তা অনেকের কাছেই অজানা। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি এলাকায় উদ্যোক্তারা ভ্যানিলা চাষ শুরু করেছেন। বিশ্ববাজারে এই মসলার প্রতি কেজি এখন প্রায় ২৫০ ডলার বা ৩০ হাজার টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এখনো কেউ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেননি।
২০১৯ সালে বগুড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে দেশে ভ্যানিলা চাষের সূচনা হয়। এখন ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে উদ্যোক্তারা স্বল্প পরিসরে এটি চাষ করছেন। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা নিয়ে গবেষণা করছেন।

একটি অবাক করা তথ্য হলো, বিভিন্ন পণ্যে সাধারণত যে ভ্যানিলা ফ্লেভার ব্যবহৃত হয়, তা আসলে কৃত্রিম। পরীক্ষাগারে রাসায়নিক দিয়ে তৈরি এই ফ্লেভারই বাংলাদেশে আমদানি হয়। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট ভ্যানিলা ফ্লেভারের ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশই কৃত্রিম। প্রাকৃতিক ভ্যানিলার উৎপাদন একেবারেই নগণ্য এবং তা মাত্র কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত।
ভ্যানিলা মূলত একটি লতানো অর্কিডজাতীয় গাছের ফল, যা ভ্যানিলা বিন বা ভ্যানিলা পড নামেও পরিচিত। কাঁচা ফলে নিজস্ব কোনো ঘ্রাণ থাকে না। পরিপক্ব হলে গাছ থেকে সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রক্রিয়াজাত করার পরই বিশেষ সেই ঘ্রাণ তৈরি হয়।
দেশে এই চাষের সূচনা করেন বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম। ২০১৯ সালে মসলা বিষয়ক এক প্রশিক্ষণে গবেষক দলের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে তিনি ভ্যানিলা চাষ সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পান। সেখান থেকে একটি গাছের কাটিং এনে গবেষণা কেন্দ্রে রোপণ করেন তিনি। পরে সেই গাছ থেকে আরও চারা তৈরি করা হয়। বর্তমানে ৩ শতক জায়গায় সেখানে ৬০টি ভ্যানিলা গাছ আছে।
ভ্যানিলা চাষ সহজ কাজ নয়। এটি সাধারণ মাটিতে হয় না। এর জন্য জৈব পদার্থে তৈরি বিশেষ মাধ্যম ও ছায়ার ব্যবস্থা লাগে। ছায়াযুক্ত বাগানে বিভিন্ন গাছেও চাষ সম্ভব হলেও শেডে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। চারা লাগানোর দুই থেকে তিন বছর পর গাছে ফুল আসতে পারে। প্রতিটি থোকায় ১৩ থেকে ১৮টি ফুল ফোটে, যা স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যেই পরাগায়ন সম্পন্ন করতে হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদনে তাই কৃত্রিম পরাগায়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়।
পরাগায়নের পর ফল পরিপক্ব হতে লাগে আরও সাত থেকে আট মাস। সাধারণত এপ্রিলে ফুল আসে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে ফল পরিপক্ব হয়। ফল সংগ্রহের পরও কাজ শেষ হয় না। প্রথমে ৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রার গরম পানিতে তিন মিনিট রাখতে হয়। এরপর ২৪ ঘণ্টা বাক্সে রেখে গাঁজন প্রক্রিয়া চালানো হয়, যাতে সবুজ ফল কালো রং ধারণ করে। তারপর এক মাস ধরে প্রতিদিন সকালে মৃদু আলোয় দুই ঘণ্টা করে রোদে শুকাতে হয়। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলার নির্যাস বের করার কোনো পদ্ধতি এখনো নেই।
ফয়সাল ফাহিম বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের জন্য উপযোগী, তা প্রমাণিত হয়েছে। তবে চাষটি অত্যন্ত শ্রমঘন এবং প্রাথমিক বিনিয়োগও বেশি। ৫০ শতক জমিতে এক হাজার গাছের বাণিজ্যিক প্রকল্প শুরু করতে ন্যূনতম ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে এটি লাভজনক কি না, তা যাচাইয়ের পরই সরকারিভাবে কৃষকদের কাটিং সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
এর মধ্যেই ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে এ চাষে বিনিয়োগ করেছেন। তাঁরা ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কাটিং আনিয়েছেন এবং নিজেরাও একে অপরকে কাটিং দিয়ে সহায়তা করছেন। এমনই একজন যশোরের উদ্যোক্তা মো. সারোয়ার হোসেন। আম ও ড্রাগন চাষের পাশাপাশি তিনি ছায়াবৃত্ত ক্যানোপি পদ্ধতিতে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেছেন। চার বছর আগে পরীক্ষা শুরু করেন তিনি। অভিজ্ঞতার অভাবে শুরুতে কিছু গাছ মারা গেলেও এখন তাঁর বাগানে প্রায় ১৫০টি গাছ বেড়ে উঠছে।
সারোয়ার হোসেনের বিশ্বাস, বাংলাদেশে ভ্যানিলা হবে না, এমন কোনো জায়গা নেই। তাঁর মতে, এখন দরকার উৎপাদন বাড়ানো। দেশের ১০০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় কাটিং দেওয়া গেলে চার থেকে পাঁচ বছর পর এক হাজার কেজি ভ্যানিলা বিন রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নিজেরাই বাংলাদেশে আসতে শুরু করবেন বলে তিনি মনে করেন।
বাজারের দিক থেকেও সম্ভাবনা কম নয়। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যানিলার বৈশ্বিক বাজার ৪১০ কোটি ডলারের বেশি। ২০৩৪ সালে এই বাজার ৬৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিবছর বাজার বাড়ছে ৬ শতাংশের বেশি হারে। জাফরানের পর ভ্যানিলাকে বিশ্বের দ্বিতীয় দামি মসলা মনে করা হয়। কয়েক বছর আগেও প্রতি কেজি ভ্যানিলার গড় দাম ছিল ৫৫০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পরে কৃত্রিম ভ্যানিলার উৎপাদন বাড়ায় দাম কমে এখনকার পর্যায়ে এসেছে।
ভ্যানিলার সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার খাদ্য ও পানীয় শিল্পে। কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি, আইসক্রিম, দই, কাস্টার্ড, ফ্লেভারড দুধ, ক্যান্ডি ও চকলেটে এটি ব্যবহৃত হয়। সুগন্ধি, প্রসাধনী ও ওষুধশিল্পেও এর চাহিদা আছে। তবে ভ্যানিলা স্বাদের সব পণ্যে প্রাকৃতিক বিন ব্যবহার হয় না। ভ্যানিলার প্রধান সুগন্ধি যৌগ ভ্যানিলিন শিল্পপদ্ধতিতেও তৈরি করা যায়, আর বাজারে কৃত্রিম ভ্যানিলার দাপটই বেশি।
ভ্যানিলার ইতিহাসও কৌতূহলোদ্দীপক। বিবিসির সাবেক সাংবাদিক টিম ইকোটের লেখা বই অনুযায়ী, বর্তমান মেক্সিকোর পাপান্তলা অঞ্চলের টোটোনাক আদিবাসীরা প্রথম ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন। পঞ্চদশ শতকে অ্যাজটেকরা তাঁদের পরাজিত করে সেই অঞ্চল দখল করে। অ্যাজটেকরা চকলেটজাতীয় বিশেষ পানীয়ের স্বাদ বাড়াতে ভ্যানিলা ব্যবহার শুরু করে। পরে মেক্সিকোতে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন চালু হলে ভ্যানিলা ও চকলেট ইউরোপে পৌঁছায়। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ইউরোপে রাজকীয় মসলায় পরিণত হয়। পরে অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিও ভ্যানিলা চাষে ঝুঁকে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এটি ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে যায়।
বর্তমানে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা উৎপাদন ও রপ্তানিতে শীর্ষে আছে আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কার। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের ভ্যানিলা রপ্তানি করেছে। রপ্তানিতে এর পরের অবস্থানে আছে ফ্রান্স, জার্মানি, উগান্ডা ও কানাডা। এসব দেশ বছরে দেড় কোটি থেকে চার কোটি ডলার পর্যন্ত রপ্তানি করে। নেদারল্যান্ডস ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিও এক কোটি ডলারের বেশি। ভ্যানিলার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র, যারা ২০২৫ সালে প্রায় ১০ কোটি ডলারের ভ্যানিলা আমদানি করেছে। এরপর আছে ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, ইতালি ও সুইজারল্যান্ড। এই দেশগুলো বিন আমদানি করে নির্যাস তৈরি করে আবার রপ্তানি করে, তাই আমদানি ও রপ্তানি দুই তালিকাতেই তাদের নাম দেখা যায়। অন্যান্য প্রধান উৎপাদক দেশের মধ্যে আছে ইন্দোনেশিয়া, উগান্ডা, মেক্সিকো, পাপুয়া নিউগিনি, ভারত, কমোরোস ও তানজানিয়া। ফরাসি পলিনেশিয়ার তাহিতি বিশেষ ধরনের ভ্যানিলার জন্য পরিচিত।
সব মিলিয়ে ভ্যানিলা চাষ বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুললেও পথটি সহজ নয়। উচ্চ বিনিয়োগ, শ্রমঘন প্রক্রিয়া, প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধার অভাব এবং কৃত্রিম ভ্যানিলার প্রতিযোগিতা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকারি সহায়তা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ জোরদার হলে উচ্চমূল্যের এই মসলা ভবিষ্যতে কৃষকের আয় ও রপ্তানি আয়ের নতুন উৎস হতে পারে।

