ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করে আবারও জীবন্ত করে তোলার উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে বুড়িগঙ্গা নদীর পানির মান ও পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানী ঘিরে থাকা অন্যান্য নদীর দূষণ রোধে সময়সীমা নির্ধারণ করে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি আন্তঃসংস্থা কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং জেলা প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা রয়েছে।
বৈঠকে বুড়িগঙ্গার বর্তমান দুরবস্থার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজব্যবস্থা, খাল দখল ও ভরাট এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
শুনতে আশাব্যঞ্জক হলেও এখানেই আসল প্রশ্ন। ঢাকার নদী রক্ষায় এর আগে কম পরিকল্পনা হয়নি। কমিটি হয়েছে, উদ্যোগ হয়েছে, অভিযান হয়েছে, নদীর পাড়ে নানা প্রকল্পও হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বুড়িগঙ্গার পানি আরও কালো হয়েছে, নদীর প্রস্থ কমেছে এবং দূষণের বোঝা বেড়েছে। তাই এবার নতুন পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যে নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল ঢাকা
বুড়িগঙ্গাকে শুধু ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদী হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। ঢাকার জন্ম ও বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে এই নদী গভীরভাবে জড়িত।
বুড়িগঙ্গা নামের অর্থই পুরোনো গঙ্গা। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে মুঘলরা যখন ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলে, তখন নদীটি ছিল শহরের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। নদীপথে পণ্য পরিবহন, মানুষের যাতায়াত, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
বাংলার মসলিন, খাদ্যশস্যসহ নানা পণ্য নদীপথে পরিবহন করা হতো। নদীর পানি ব্যবহার করত নগরবাসী। মাছ ছিল নদীঘেঁষা মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস। নদীর উত্তর তীর ধরে গড়ে উঠেছিল বসতি, বাজার, গুদাম, ঘাট ও নানা স্থাপনা।
আজও সদরঘাট রাজধানীকে দেশের নদীমাতৃক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে চলেছে। তবে একসময় যে নদী ছিল ঢাকার প্রধান যোগাযোগপথ, বাজার, পানির উৎস এবং নগরের প্রাণপ্রবাহ, সেই নদীকেই আধুনিক নগরায়ণের চাপে ধীরে ধীরে পরিণত করা হয়েছে বর্জ্য বহনের পথে।
কীভাবে নদীটি নর্দমায় পরিণত হলো
ঢাকার বিস্তার যত বেড়েছে, নদীর ওপর চাপও তত বেড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী ও খাল দখল, শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে জটিল করেছে।
ট্যানারি, রং ও রাসায়নিক কারখানার বর্জ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পয়োনিষ্কাশনের পানি, হাসপাতালের বর্জ্য, তেল, প্লাস্টিক এবং প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি আবর্জনা। শহরের বিভিন্ন ড্রেন দিয়ে এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে পড়েছে।
হাজারীবাগের ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার পর দূষণের একটি বড় উৎস কমেছিল। কিন্তু তাতে বুড়িগঙ্গা আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। কারণ নদী দূষণের সমস্যা কোনো একটি শিল্প বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো নগরব্যবস্থার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতার সঙ্গে এটি জড়িত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ও পয়োনিষ্কাশনের ৮০ শতাংশের বেশি সংযুক্ত জলপথে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে শহরের অর্ধেকের বেশি খাল হয় হারিয়ে গেছে, নয়তো বর্জ্য ও দখলের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। নদীতে যখন স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যায়, তখন নগর থেকে আসা বিপুল বর্জ্যের তুলনায় তা বহন করার মতো স্বাভাবিক প্রবাহ থাকে না। ফলে দূষণ আরও ঘনীভূত হয়।
নদী বাঁচানো মানে শুধু পানি পরিষ্কার করা নয়
বুড়িগঙ্গার সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী রয়েছে। এর পাশাপাশি একসময় রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য খাল।
এই নদী ও খালগুলো মিলে বর্ষার পানি নিষ্কাশনের একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। কিন্তু খাল ভরাট হয়েছে, ড্রেন ও পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়েছে, নদীর তীর দখল হয়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই নগরের বিভিন্ন অংশে পানি জমে যায়।
জলাবদ্ধতা কমাতে নানা সময়ে পাম্প বসানো হয়েছে। কিন্তু পাম্প দিয়ে একটি শহরের ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার পুরো বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।
নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে একদিকে যেমন দূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে বর্ষার পানি দ্রুত সরানোও সহজ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়, ঢাকার ভবিষ্যৎ বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বাস্থ্য
দূষিত নদীর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটি অংশ নদীর তীরবর্তী দরিদ্র জনগোষ্ঠী। দূষিত পানি, দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশ তাদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। পানিবাহিত রোগ, ত্বকের সমস্যা ও শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
দূষণের প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই থেমে থাকে না। মাছ, গবাদিপশু ও কৃষিজ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দূষিত পানির বিভিন্ন উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে ঢাকার পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরতা বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ভবিষ্যতে পরিশোধিত পৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা দরকার। নদী ও জলাশয়গুলোকে জীবন্ত রাখা সেই সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে।
একটি পরিষ্কার নদী শুধু পানি বহন করে না। এটি একটি শহরের পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, জীববৈচিত্র্য ধরে রাখে এবং মানুষের বিনোদন ও অবসর কাটানোর সুযোগ তৈরি করে।
বিশ্বের অনেক শহর একসময় অবহেলিত নদীতীর পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। কারণ তারা বুঝেছে, নদীকে ধ্বংস করে কোনো শহর দীর্ঘমেয়াদে বাসযোগ্য থাকতে পারে না।
নদী বাঁচলে অর্থনীতিও লাভবান হবে
বুড়িগঙ্গা পরিষ্কার করার অর্থ শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, এর সঙ্গে ঢাকার অর্থনীতিও জড়িত।
নদীপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সড়কপথের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে করা সম্ভব। নৌপরিবহন বাড়ানো গেলে ঢাকার সড়কের ওপর চাপ কিছুটা কমানো যেতে পারে।
পরিষ্কার নদী মাছের উৎপাদন, নৌযান চলাচল, নদীকেন্দ্রিক বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পর্যটনের সুযোগও বাড়াতে পারে। পুরান ঢাকার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো নতুন অর্থনৈতিক প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
তবে নদীর পাড়ে কংক্রিটের স্থাপনা বানানো, রেস্তোরাঁ তৈরি করা কিংবা আলোকসজ্জা বসানোকে নদী পুনরুদ্ধার বলা যাবে না। নদীর পানি যদি দূষিতই থাকে, স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকে এবং তীর যদি দখল হয়ে থাকে, তাহলে সুন্দর পাড় তৈরি করে আসলে সমস্যাকে শুধু আড়াল করা হবে।
একইভাবে নদীর তীরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষদের উচ্ছেদ করলেই নদী রক্ষা হবে না। দখলদার ও দূষণকারী শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।
নদী পুনরুদ্ধারের মূল কাজ শুরু করতে হবে দূষণের উৎস থেকে।
পরিকল্পনার অভাব নয়, বাস্তবায়নের সংকট
বাংলাদেশে নদী রক্ষার জন্য আইন নেই—বিষয়টি এমন নয়। গবেষণা হয়েছে, পরিকল্পনা হয়েছে, প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। সমস্যা হলো এসব উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের ঘাটতি।
চারটি নদী ও ২২টি খাল পুনরুদ্ধারের জন্য ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ কর্মসূচি রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নদী পুনরুদ্ধারের জন্য ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার অনুমোদন করেছে।
এখন নতুন কর্মপরিকল্পনা যদি শুধু আরেকটি নথিতে পরিণত হয়, তাহলে তার কোনো অর্থ থাকবে না। বরং ইতিমধ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে কে কখন কী কাজ করবে, তার স্পষ্ট হিসাব দিতে হবে।
কোন কারখানা থেকে কত বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে, কোথায় অবৈধ সংযোগ রয়েছে, কোন ড্রেন নদীতে পড়ছে, কোথায় খাল দখল হয়েছে—সবকিছু মানচিত্রে চিহ্নিত করতে হবে।
প্রতিটি সংস্থার জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব, বাজেট ও সময়সীমা থাকা দরকার। পাশাপাশি নদীর পানির মান নিয়মিত পরিমাপ করে সেই তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে।
শুধু পরিদর্শনের সময় বর্জ্য পরিশোধনাগার চালু রেখে কোনো লাভ নেই। কারখানাকে সব সময় কার্যকর পরিশোধনাগার চালাতে হবে। যারা দূষণ করবে, তাদের কাছ থেকেই দূষণের খরচ আদায় করতে হবে।
শিল্পকারখানার বর্জ্য বন্ধ না হলে নদী পরিষ্কার হবে না
শিল্পকারখানাগুলোকে নিজেদের বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে প্রতিটি কারখানার জন্য আলাদা পরিশোধনাগার স্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়, সেখানে একাধিক কারখানাকে নিয়ে যৌথ বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
শুধু শিল্পবর্জ্য নয়, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে। পয়োনিষ্কাশন, মলমূত্র ব্যবস্থাপনা এবং বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহ—এই তিনটি ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর না হলে নদী দূষণ বন্ধ করা কঠিন।
নদী ও খালে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে হবে। খাল দখল ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। দখলমুক্ত করার সময় অসহায় মানুষদের মানবিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
নদী খনন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। নদীর তলদেশে জমে থাকা দূষিত কাদা শুধু এক জায়গা থেকে তুলে অন্য জায়গায় ফেললে সমস্যা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই খননের আগে মাটির দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে এবং দূষিত পলি নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
এর পাশাপাশি নদীতে স্বাভাবিক মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, নিয়মিত পানি পরীক্ষা করা এবং বারবার আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এবার দরকার জবাবদিহি
নদী রক্ষার উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপর—জবাবদিহি।
বছরের পর বছর বৈঠক হয়েছে, ঘোষণা এসেছে, প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ জানতে পারেনি কোন লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে। এবার সেই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে যদি আন্তঃসংস্থা কমিটি কাজ করে, তাহলে সেই কমিটির কাজের অগ্রগতিও নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। তিন মাস পরপর অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। কোন সংস্থা নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে পারেনি, কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান দূষণ বন্ধ করেনি এবং কোথায় দখল উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি—এসব তথ্যও প্রকাশ্যে আসা উচিত।
পরিবেশবাদী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নদীর তীরবর্তী মানুষেরাও নজরদারিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
কারণ নদী রক্ষা কোনো স্বেচ্ছাসেবী প্রকল্প নয়। এটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো মানে ঢাকাকে বাঁচানো
বুড়িগঙ্গা আজ যে অবস্থায় পৌঁছেছে, সেটি একদিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা, দখল, দূষণ এবং পরিকল্পনার ঘাটতি ধীরে ধীরে নদীটিকে তার স্বাভাবিক চরিত্র থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
তাই একদিনের অভিযান বা কয়েক মাসের প্রকল্প দিয়ে এই নদীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছুর সমন্বয় দরকার।
সবচেয়ে বড় কথা, নদী পুনরুদ্ধারকে শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। বুড়িগঙ্গা ঢাকার পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, পরিবহন, পরিবেশ ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীটি সুস্থ হলে শহরও তার সুফল পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ তাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে বৈঠক শেষ হওয়ার পর। কর্মপরিকল্পনা তৈরি হওয়ার পরও যদি আগের মতোই কারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ে, খাল দখল হতে থাকে, ড্রেন বন্ধ থাকে এবং আইন ভঙ্গকারীরা পার পেয়ে যায়, তাহলে নতুন উদ্যোগও আগের ব্যর্থ পরিকল্পনার তালিকায় যুক্ত হবে।
অন্যদিকে এবার যদি প্রতিটি দূষণের উৎস চিহ্নিত করা যায়, প্রতিটি সংস্থাকে নির্দিষ্ট দায়িত্বের মধ্যে আনা যায়, নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনা যায় এবং দূষণকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়, তাহলে বুড়িগঙ্গার জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে বাঁচানো নয়। এর অর্থ ঢাকার হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানো, মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করা, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য রাজধানীর সুযোগ তৈরি করা।
একসময় বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার প্রাণ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি নদীটিকে আবার সেই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব?

