২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখের বেশি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন এসেছে। এত বড় আবেদনসংখ্যা সামলাতে গিয়ে সরকার প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে এবং কোন ধরনের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসবে, তা নির্দিষ্ট করে নতুন নীতিমালা তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি ১২ লাখ আবেদন মানেই ১২ লাখ শিক্ষার্থী নয়। একজন শিক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন। ফলে সংখ্যাটি মূলত পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসা উত্তরপত্রের আবেদনসংখ্যা হিসেবে বোঝা হচ্ছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছিল। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদ্রাসা বোর্ডে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি বোর্ডে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন ছিল। ফল প্রকাশের পর এত বড় সংখ্যায় পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন পড়া পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের ফল নিয়ে আস্থার প্রশ্নটিকেও সামনে আনছে।
শিক্ষামন্ত্রী সোমবার ঢাকার বনানীতে আয়োজিত কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই ভবিষ্যতে কোন ধরনের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসবে, সে বিষয়ে আলাদা নীতিমালা করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, সরকার শুধু আবেদন কমানোর কথা ভাবছে না; বরং কোন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ পাবেন, সেটিকেও আরও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার চিন্তা করছে।
এখানেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। প্রচলিত ‘বোর্ড চ্যালেঞ্জ’ বা পুনঃনিরীক্ষণকে অনেকেই খাতা নতুন করে মূল্যায়ন করা মনে করেন। আসলে বর্তমান ব্যবস্থায় এটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন নয়। উত্তরপত্রে দেওয়া নম্বর ঠিকভাবে যোগ হয়েছে কি না, কোনো প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়ন বাদ পড়েছে কি না, নম্বর ওএমআর বা নম্বরপত্রে সঠিকভাবে তোলা হয়েছে কি না এ ধরনের বিষয় মূলত যাচাই করা হয়। ভুল ধরা পড়লে সংশোধিত ফল দেওয়া হয়।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষার্থী যদি মনে করেন, তার উত্তরটি পরীক্ষক ঠিকভাবে মূল্যায়ন করেননি বা কোনো উত্তরের জন্য কম নম্বর দিয়েছেন, শুধু প্রচলিত পুনঃনিরীক্ষণ আবেদনে সেই উত্তর নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ সাধারণত থাকে না। ফলে ১২ লাখের বেশি উত্তরপত্রের আবেদন আসার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক চাপের বিষয় নয়; এটি প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বিদ্যমান পুনঃনিরীক্ষণ ব্যবস্থার মধ্যে একটি ফাঁকও দেখাচ্ছে।
এই উদ্বেগ একেবারে নতুন নয়। ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণে দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোতে হাজার হাজার উত্তরপত্রে পরিবর্তন আসে। শুধু ঢাকা বোর্ডেই ৯২ হাজার ৮৬৩ জন শিক্ষার্থী ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৬৪টি খাতার পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিল। সারাদেশের হিসাবেও নতুন করে পাস করা ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘কতজন আবেদন করল’ এখানে থেমে থাকে না। একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মনে করেন তার প্রাপ্য নম্বর তিনি পাননি, তাহলে সেই ফল সংশোধনের পথটি কতটা সহজ, দ্রুত ও কার্যকর সেটিই বড় বিষয়। বিশেষ করে এসএসসির ফলের সঙ্গে কলেজে ভর্তি, পছন্দক্রম এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের সিদ্ধান্ত সরাসরি যুক্ত থাকায় একটি নম্বরের পার্থক্যও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য বড় হয়ে উঠতে পারে।
এখন পর্যন্ত সরকার নতুন নীতিমালার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। ফলে কোন শিক্ষার্থী বা কোন ধরনের উত্তরপত্র ভবিষ্যতে পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ পাবে, আবেদনসংখ্যা কীভাবে সীমিত করা হবে কিংবা পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়নের কোনো সুযোগ তৈরি হবে কি না এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে নীতিমালা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার জায়গাটি তৈরি হয়েছে। বিপুল আবেদন একদিকে বোর্ডগুলোর ওপর প্রশাসনিক চাপ বাড়ায়, অন্যদিকে যদি পুনঃনিরীক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই হয় হিসাব, বাদ পড়া উত্তর বা নম্বর স্থানান্তরের ভুল খুঁজে বের করা, তাহলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা এবং প্রক্রিয়ার বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যে ব্যবধান থেকেই যায়। নতুন নীতিমালা হলে সেই ব্যবধান কমানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি পরীক্ষার ফল শুধু একটি সংখ্যা নয়। সেই সংখ্যার ওপর একজন শিক্ষার্থীর কলেজ নির্বাচন, পরিবারে প্রত্যাশা এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পরিকল্পনা নির্ভর করতে পারে। তাই পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন কমানোই যদি নতুন নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে সেটি যথেষ্ট হবে না। বরং কেন এত শিক্ষার্থী ফল প্রকাশের পর আবার খাতা যাচাই করাতে চাইছে, মূল্যায়নের কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং ভুল ধরা পড়লে দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নতুন নীতিমালার কেন্দ্রে থাকা দরকার।

