গত মাসে ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার তিনটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এসব ভূমিকম্পে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়। এর আগে জুনে উত্তর ভেনেজুয়েলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরপর বড় ভূমিকম্পের এই ঘটনাগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, পৃথিবী কি আগের তুলনায় বেশি কাঁপছে?
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প ঘটে। তবে এসব ভূমিকম্পের অধিকাংশই এত দুর্বল যে মানুষ সেগুলোর কম্পন অনুভব করতে পারে না। ভূমিকম্পের মাত্রা ৬ বা তার বেশি হলে সাধারণত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে থাকে।
২০২৬ সালের সবচেয়ে শক্তিশালী ১০টি ভূমিকম্পের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি আঘাত হানে ফিলিপাইনে। জুনে মিন্দানাওয়ের উপকূলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ওই ভূমিকম্প হয়। এতে ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। একই মাসে ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এসব ভূমিকম্পে ৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
সাম্প্রতিক বড় ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে মেক্সিকো এবং আগস্টে কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আঘাত হানা ভূমিকম্পগুলোও উল্লেখযোগ্য। এসব ভূমিকম্পের প্রতিটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ বা তার বেশি।
তবে এক বছরে কয়েকটি বড় ভূমিকম্প কাছাকাছি সময়ে ঘটলেই পৃথিবী আগের চেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে গেছে, এমনটা বলা যায় না। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রতিবছর গড়ে ৬ বা তার বেশি মাত্রার ১৩৩টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। অবশ্য বছরভেদে এই সংখ্যা কমবেশি ছিল। ২০২৪ সালে সবচেয়ে কম ৯৯টি এবং ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ১৫৭টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
২০২৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বে ৬ বা তার বেশি মাত্রার ৯১টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ মাত্রার বেশি ছিল ১১টি। গত ১০ বছরের গড়ের তুলনায় এ সংখ্যা কিছুটা বেশি হলেও এখনো তা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে। চলতি বছরে এখনো ৮ বা ৯ মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হয়নি। সাধারণত এ ধরনের ভূমিকম্পই সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে।
কোনো ভূমিকম্প কতটা প্রাণঘাতী হবে, সেটি শুধু তার মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। বরং ভূমিকম্পটি কোথায় আঘাত হেনেছে, সেটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর গভীরতা, জনবসতিপূর্ণ শহরের কতটা কাছে এটি আঘাত করেছে এবং ওই এলাকার ভবনগুলো কতটা শক্তিশালী—এসব বিষয় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
গত ১০ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পগুলোর অনেকগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল না। জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি বা নিচে আঘাত হানার কারণে এসব ভূমিকম্পে প্রাণহানি বেশি হয়েছে।
ভূমিকম্পের কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমও নেই। দীর্ঘদিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের সব সময়ই ভূমিকম্প ঘটে এবং এর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমি ধারা নেই।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে বা ইউএসজিএস জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি কখন কোনো বড় ভূমিকম্প আঘাত হানবে। ফল্ট লাইনে কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে জমা হতে থাকা টেকটোনিক চাপকে ১২ মাসের কোনো নির্দিষ্ট চক্রের সঙ্গে মেলানো যায় না। আবার বড় ভূমিকম্প হয়ে যাওয়ার পরও ঝুঁকি শেষ হয় না। এর পরবর্তী আফটারশক কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
ভূমিকম্পবিদরা কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প কখন ঘটবে, তা আগাম বলে দেওয়ার পরিবর্তে কোনো এলাকায় কয়েক বছরের মধ্যে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা হিসাব করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণের নিয়ম তৈরি করা হয়।
ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর দ্রুত মানুষকে সতর্ক করতেও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। তবে এসব ব্যবস্থা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয় না। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর সম্ভাব্য শক্তিশালী কম্পন পৌঁছানোর আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে।
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হলো প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার। পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ঘটে। পশ্চিম আমেরিকা থেকে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল বলয় হলো রিং অব ফায়ার। এর মধ্যে জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ রয়েছে। এসব এলাকায় প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।
তবে ভূমিকম্পের ঘটনা শুধু রিং অব ফায়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাভা থেকে হিমালয় হয়ে তুরস্ক ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত আল্পাইড বলয়েও বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ১৭ শতাংশ এই অঞ্চলে আঘাত হানে।
এ ছাড়া কোনো প্লেটের সীমানা থেকে অনেক দূরেও ভূমিকম্প হতে পারে। এসব এলাকায় মাটির নিচে থাকা বহু পুরনো চ্যুতি বা ফাটল বরাবর মাঝেমধ্যে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
ভূমিকম্পের শক্তি বা মাত্রা মাপতে বর্তমানে মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে কতটা শক্তি বা ভূকম্পন শক্তি নির্গত হয়েছে, তা হিসাব করা হয়। সহজভাবে বললে, ভূমিকম্প যত শক্তিশালী হয়, এর মাত্রাও তত বেশি হয়। বড় ভূমিকম্পের মাত্রা নির্ধারণে বর্তমানে এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
ভূমিকম্পের মাত্রা লগারিদমিক স্কেলে মাপা হয়। অর্থাৎ মাত্রা এক ধাপ বাড়লে মাটির কম্পনের তীব্রতা প্রায় ১০ গুণ এবং নির্গত শক্তি প্রায় ৩২ গুণ বেড়ে যায়।
৪ থেকে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে তুলনামূলক হালকা হিসেবে ধরা হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এসব ভূমিকম্পেও ভবন ও স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৪ মাত্রার তুলনায় মাটির কম্পন প্রায় ১০ গুণ বেশি হয় এবং প্রায় ৩২ গুণ বেশি শক্তি নির্গত হয়। এ ধরনের ভূমিকম্পে ভবনে মাঝারি ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
৬ মাত্রার ভূমিকম্পকে সাধারণত শক্তিশালী হিসেবে ধরা হয়। ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের তুলনায় এতে মাটির কম্পন প্রায় ১০০ গুণ বেশি এবং নির্গত শক্তি প্রায় এক হাজার গুণ বেশি হয়। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
৭ মাত্রার ভূমিকম্পকে বড় ধরনের ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। ভবন, সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর ৮ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পকে অত্যন্ত ভয়াবহ বা মহাবিপর্যয়কর হিসেবে ধরা হয়। এতে বিশাল একটি এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে।
তবে শুধু ভূমিকম্পের মাত্রা দিয়ে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যায় না। একটি ভূমিকম্প কতটা প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক হবে, তা আরও কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমিকম্পটি কত গভীরে ঘটেছে, জনবসতিপূর্ণ এলাকার কতটা কাছে আঘাত হেনেছে, এলাকার মাটির ধরন ও অবস্থা, ভবন ও অবকাঠামো কতটা শক্তিশালী এবং ভূমিকম্পের পর সুনামি, ভূমিধস বা অন্য কোনো গৌণ দুর্যোগের আশঙ্কা আছে কি না।
এ কারণে তুলনামূলক কম মাত্রার ভূমিকম্পও ঘনবসতিপূর্ণ এবং দুর্বল অবকাঠামোর এলাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল চিলিতে। ১৯৬০ সালের ২২ মে চিলির ভালদিভিয়া অঞ্চলে ৯ দশমিক ৫ মাত্রার ওই ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টি হয়।
চার বছর পর ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ড এলাকায় ৯ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটি ইতিহাসে নথিভুক্ত দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এরপর ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর আরেকটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলে ৯ দশমিক ১ থেকে ৯ দশমিক ৩ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের পর ভারত মহাসাগরে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টি হয়। এতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার মানুষ নিহত হন।

