পৃথিবীতে মানুষের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী কোনটি—এই প্রশ্নের উত্তর শুনলে অনেকেই অবাক হতে পারেন। বাঘ বা সাপ নয়, বরং ক্ষুদ্র এই মশাই প্রতিবছর ছয় লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য—মানুষের রক্তের প্রতি মশার এই আকর্ষণের সূচনা হয়েছিল প্রায় আঠারো লাখ বছর আগে।
বিজ্ঞানবিষয়ক একটি সাময়িকীর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি মশার লালার মাধ্যমে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, ডেঙ্গু এবং বিভিন্ন ধরনের মস্তিষ্কপ্রদাহজনিত রোগও ছড়িয়ে থাকে। তবে সব মশা মানুষের রক্ত খায় না—পৃথিবীতে থাকা প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশার মধ্যে তুলনামূলকভাবে অল্প কয়েকটি প্রজাতিই মানুষের জন্য সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ।
সায়েন্টিফিক রিপোর্টস নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় একদল বিজ্ঞানী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সংগৃহীত একটি নির্দিষ্ট মশার গোষ্ঠীর এগারোটি প্রজাতির আটত্রিশটি নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন। এরপর কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে এই মশাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনীয় ইতিহাস ও জিনগত পরিবর্তনের ধারা পুনর্গঠন করেন তাঁরা।
গবেষণার ফলাফল বলছে, এই গোষ্ঠীর মশাদের মধ্যে মানুষের রক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল মাত্র একবারই, আর তা ঘটেছিল আনুমানিক ষোলো থেকে ঊনত্রিশ লাখ বছর আগে—সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি প্রাচীন ভূখণ্ডে, যা বর্তমান বোর্নিও, জাভা, মালয় উপদ্বীপ ও সুমাত্রার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল।
এর আগে এই মশারা মূলত আশপাশের অন্যান্য প্রাইমেট প্রজাতির রক্তই খেত। গবেষকদের ধারণা, প্রায় আঠারো লাখ বছর আগে হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির প্রাচীন মানুষ ওই অঞ্চলে পা রাখার পরই ধীরে ধীরে মশাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আধুনিক মানুষ অবশ্য সেই অঞ্চলে পৌঁছায় আরও অনেক পরে—মাত্র তেষট্টি থেকে ছিয়াত্তর হাজার বছর আগে। অর্থাৎ মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মশার এই সম্পর্কের সূচনা আধুনিক মানুষের আবির্ভাবেরও বহু আগে থেকেই।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষকে খুঁজে বের করার প্রয়োজনে মশার শরীরে ধীরে ধীরে জিনগত পরিবর্তন ঘটে থাকতে পারে, যার মাধ্যমে তারা মানুষের শরীরের নির্দিষ্ট গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষমতা অর্জন করে। তবে এমন পরিবর্তনের জন্য সেই সময় ওই অঞ্চলে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষের অস্তিত্ব থাকাও জরুরি ছিল বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, মশার এই বিবর্তনীয় ইতিহাস অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে কেবল মশা সম্পর্কেই নয়, বরং মানুষের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের বিকাশ এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে তাদের বিস্তারের ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন ধারণা পাওয়া সম্ভব—বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চলে, যেখানে প্রাচীন মানব জীবাশ্মের সরাসরি প্রমাণ তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

