প্রশান্ত মহাসাগর কিংবা আটলান্টিক মহাসাগরের হাজার হাজার ফুট গভীরে যদি নামা যায়, সেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। চারদিকে বিরাজ করে ঘন অন্ধকার। যত নিচে যাওয়া যায়, ততই অপরিচিত হয়ে ওঠে সমুদ্রের পরিবেশ। এমন গভীরতায় হঠাৎ যদি হ্রদের মতো কোনো জলাধার দেখা যায়, সেটি যে বিস্ময়ের কারণ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই অদ্ভুত জলাধারের রয়েছে নিজস্ব তীর। পানির ওপর মৃদু ঢেউও দেখা যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, চারপাশে বিশাল সমুদ্র থাকা সত্ত্বেও এর পানি সহজে আশপাশের সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশে যায় না।
গভীর সমুদ্রের এমন অস্বাভাবিক জলাধারকে বলা হয় ‘ব্রাইন পুল’। সমুদ্রের তলদেশে দেখা পাওয়া এই ব্রাইন পুলগুলো পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা।
মেক্সিকো উপসাগর, ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের সমুদ্রতলে ব্রাইন পুলের সন্ধান পাওয়া গেছে। সমুদ্রতলের বিভিন্ন গর্ত বা নিচু এলাকায় অত্যন্ত লবণাক্ত পানি জমে এসব পুল তৈরি হয়। চারদিকে সমুদ্রের পানি থাকলেও ব্রাইন পুলের পানি আলাদা অবস্থায় থাকার প্রধান কারণ হলো পানির ঘনত্বের পার্থক্য।
একটি ব্রাইন পুলের পানি সাধারণ সমুদ্রের পানির তুলনায় তিন থেকে আট গুণ বেশি লবণাক্ত হতে পারে। পানিতে অতিরিক্ত লবণ থাকার কারণে এর ঘনত্বও বেড়ে যায়। ফলে অত্যন্ত ঘন এই লবণাক্ত পানি ওপরের তুলনামূলক কম ঘন সমুদ্রের পানির সঙ্গে সহজে মিশে না। বরং ঘন পানিটি সমুদ্রতলের নিচু কোনো স্থানে জমা হয়ে একটি পানির নিচের হ্রদের মতো আকৃতি তৈরি করে।
দুই ধরনের পানির মাঝখানে যে স্পষ্ট সীমানা তৈরি হয়, সেটিকে বলা হয় ‘হ্যালোক্লাইন’। রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল বা আরওভি এবং মানববাহী সাবমার্সিবলের মাধ্যমে এসব এলাকা অনুসন্ধান করা বিজ্ঞানীরা এই সীমানা অতিক্রম করার সময় পানির ঘনত্বের পার্থক্য খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
কখনো কখনো ব্রাইনের অতিরিক্ত ঘনত্ব সাবমার্সিবলের ভাসমান ক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এ ধরনের ঘন লবণাক্ত পানির পুলের ভেতরে কোনো যান প্রবেশ করানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মেক্সিকো উপসাগরের সবচেয়ে আলোচিত ব্রাইন পুলগুলোর একটি হলো ‘জাকুজি অব ডেসপেয়ার’ বা ‘হতাশার জাকুজি’। সেখানে বিদ্যমান চরম ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বিজ্ঞানীরা এই নাম দিয়েছেন।
এই পুলে প্রায় কোনো অক্সিজেন নেই। একই সঙ্গে পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড ও মিথেনের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের পরিমাণ বেশি। ফলে অধিকাংশ সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য এই অতিরিক্ত লবণাক্ত ও রাসায়নিকভাবে প্রতিকূল পানিতে প্রবেশ করা প্রাণঘাতী হতে পারে।
কাঁকড়া ও মাছের মতো সামুদ্রিক প্রাণী ব্রাইন পুলের খুব কাছাকাছি গেলে এমন একটি পরিবেশের মুখোমুখি হয়, যেখানে লবণাক্ততা অত্যন্ত বেশি এবং রাসায়নিক উপাদানও প্রতিকূল। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এসব প্রাণীর কোষ থেকে পানি বের হয়ে যেতে পারে। এর ফলে তাদের শরীরে মারাত্মক অসমোটিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্রাইন পুলের এমন পরিবেশ জৈব পদার্থের পচনপ্রক্রিয়াকেও ধীর করে দিতে পারে। এ কারণে কিছু ব্রাইন পুলের কিনারায় সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহ জমে থাকতে দেখা যায়। সমুদ্রের গভীরে এমন দৃশ্য তৈরি করে এক ধরনের ভৌতিক পরিবেশ।
তবে এসব পানির নিচের হ্রদ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। অনেক ব্রাইন পুলের উৎপত্তির সঙ্গে লাখ লাখ বছর আগের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বহু ব্রাইন পুলের সঙ্গে প্রাচীন সমুদ্রের রেখে যাওয়া বিশাল লবণের স্তরের সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে পৃথিবীর অগভীর সমুদ্রের কিছু অংশ বারবার শুকিয়ে গিয়েছিল। এসব সমুদ্রাঞ্চল শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সেখানে পুরু লবণের স্তর জমা হয়।
পরবর্তী দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে টেকটোনিক গতিবিধির কারণে এসব লবণের স্তর পলির নিচে চাপা পড়ে যায়। পরে সমুদ্রতলের বিভিন্ন ফাটল এবং শিলার ভেতর দিয়ে সমুদ্রের পানি প্রবেশ করে। সেই পানি প্রাচীন লবণের স্তরের সংস্পর্শে এসে সেগুলো দ্রবীভূত করতে থাকে।
এর ফলে খনিজসমৃদ্ধ অত্যন্ত ঘন লবণাক্ত পানি বা ব্রাইন তৈরি হয়। ভূতাত্ত্বিক ফাটল দিয়ে এই পানি আবার সমুদ্রতলের দিকে বেরিয়ে আসে এবং প্রাকৃতিকভাবে তৈরি নিচু এলাকায় জমা হতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা এই ঘন লবণাক্ত পানির স্তরই পরিণত হয়েছে আজকের পরিচিত পানির নিচের হ্রদ বা ব্রাইন পুলে।
তবে ব্রাইন পুলের পরিবেশ অধিকাংশ সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হলেও এসব স্থান পুরোপুরি প্রাণহীন নয়। বরং এসব পুলের সীমানায় এমন কিছু জীবের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাণীর জন্য অসম্ভব পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীরা ব্রাইন পুলের কিনারায় ‘এক্সট্রিমোফাইল’ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের অণুজীবের সন্ধান পেয়েছেন। অতিরিক্ত লবণাক্ততা, বিষাক্ততা কিংবা অক্সিজেনের অভাবের মতো চরম পরিস্থিতিতেও এসব অণুজীব বেঁচে থাকতে এবং বংশবিস্তার করতে পারে।
এদের কেউ কেউ সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল সালোকসংশ্লেষণের পরিবর্তে কেমোসিন্থেসিসের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন করে। অর্থাৎ সূর্যের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহের বদলে মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়ার মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় শক্তি পায়।
এই অণুজীবগুলো ব্রাইন পুলের প্রান্তে গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে। ফলে প্রাণঘাতী বলে মনে হওয়া এই পরিবেশেও একটি স্বতন্ত্র জীবসমাজ গড়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এসব এলাকার ভেতরে ও আশপাশে বিশাল আকৃতির পলিকিট কৃমি, বিশেষ ধরনের ঝিনুক এবং ছোট আকারের ক্রাস্টেশিয়ানের উপস্থিতিও লক্ষ্য করেছেন। তাদের টিকে থাকা প্রমাণ করে, বাইরে থেকে সম্পূর্ণ প্রতিকূল বলে মনে হওয়া পরিবেশেও জটিল জীবসমাজ অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারে।
ব্রাইন পুল তাই শুধু সমুদ্রের নিচে তৈরি অদ্ভুত কোনো জলাধার নয়। বিজ্ঞানীদের কাছে এগুলো চরম পরিবেশে জীবনের অভিযোজন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার।
এসব পুলের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, সৃষ্টির পেছনে থাকা প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং সেখানে টিকে থাকা জীবগুলো নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, পৃথিবীর বাইরে একই ধরনের চরম পরিবেশে প্রাণের অস্তিত্ব কীভাবে সম্ভব হতে পারে।
সমুদ্রের ঢেউ থেকে হাজার হাজার ফুট নিচে, সূর্যের আলো থেকে সম্পূর্ণ দূরে এবং ওপরের পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা এসব অদ্ভুত পানির নিচের হ্রদ পৃথিবীর সমুদ্র সম্পর্কে মানুষের সীমিত জ্ঞানকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এসব ব্রাইন পুল যেন মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সমুদ্র এখনো এমন অনেক পরিবেশ ধারণ করে, যেগুলো দেখতে প্রায় ভিনগ্রহের কোনো জগতের মতো। যেখানে অধিকাংশ প্রাণীর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব, সেখানেও জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলে টিকে থাকতে পারে এবং নিজস্ব উপায়ে বিকশিত হতে পারে।

