গ্লোবাল ফ্যাশন শিল্প এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে। পোশাক কোম্পানিগুলো আর শুধু দাম আর ডেলিভারি সময় নিয়ে চিন্তা করে না; তারা এখন দেখে কারখানা পরিবেশবান্ধব কিনা, কতটা কার্বন নিঃসরণ করছে, জ্বালানি কোথা থেকে আসছে। আর এই বাস্তবতায় পেছনে না পড়তে হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হবে। সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় জানানো হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক খাতের কার্বন নিঃসরণ ৫০ শতাংশ কমাতে প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।
‘পরিবর্তনশীল জ্বালানি প্রেক্ষাপটে পোশাক খাতে কার্বনমুক্তকরণের অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে এইচএসবিসি বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), বাংলাদেশে অবস্থিত সুইডিশ দূতাবাস এবং অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউট (এআইআই)। সেখানে সরকারি মন্ত্রণালয়, বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ড, তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও শিল্প সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এআইআই-এর ক্রিস্টিনা এলিন্ডার লিল্হাস গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন।
এই বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে পুরো শিল্পখাত। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন বিশাল অঙ্কের অর্থ যার বেশিরভাগই আসতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনা ও শক্তিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি আপগ্রেডে। বর্তমানে পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অথচ ইউরোপের বাজার এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘ইউরোপীয় বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা যখন সীমিত কার্বন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।
শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, এই বিনিয়োগ ব্যবসায়িক দিক থেকেও জরুরি। গবেষণা বলছে, ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করলে পোশাক খাতের মাসিক জ্বালানি খরচ ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমানো সম্ভব। এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে জ্বালানি রূপান্তরের বাণিজ্যিকায়ন এখন সময়ের দাবি। সহায়ক নীতি, উন্নত প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হবে’।
তবে এই বিনিয়োগের পথ মসৃণ নয়। বর্তমানে নিশ্চিত অর্থায়ন রয়েছে মাত্র ১.৬ বিলিয়ন ডলার, এবং পাইপলাইনে আরও ১৭৫ মিলিয়ন ডলার। বাকি প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারের জন্য নতুন অর্থায়নের উৎস খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের বার্ষিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ বর্তমানে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের কম। অর্থায়নের এই ফাঁক পূরণ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সুইডেনের মতো উন্নয়ন সহযোগীরা ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছে। সুইডেন ‘ইনস্পায়ার’ (InSPIRE) উদ্যোগ চালু করেছে, যা পোশাক খাতকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরে সহায়তা করছে। তবে এই সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
বাংলাদেশের পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি যোগায়। এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর আর বিকল্প নয়, এটি এখন বাধ্যতামূলক। ইউরোপের কঠোর পরিবেশবান্ধব নীতি, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর টেকসই সোর্সিং লক্ষ্যমাত্রা; সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে দ্রুত পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হবে। সময় কম, বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু এই বিনিয়োগই শুধু পারে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাজারে টিকিয়ে রাখতে।

