জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় পাঁচ বছর মেয়াদি একটি বড় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধার, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়ন, সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথিতে পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মপরিকল্পনার এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এতে প্রকৃতি নির্ভর জলবায়ু অভিযোজনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং কার্বন বাজারের মতো নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, চরম আবহাওয়া এবং ভয়াবহ বায়ুদূষণের মতো বড় পরিবেশগত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। একই সময়ে তাপ অনুভূতির মাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। এতে অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
সরকার মনে করছে, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
এই পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসূচির অন্যতম বড় অংশ হলো ব্যাপক বৃক্ষরোপণ। রাস্তা, মহাসড়ক, বাঁধ, নদীর তীর ও খালের পাশে পতিত জমিতে নতুন বন সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি সরকারি বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার এবং উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ করা হবে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট এবং দেশের মধ্যাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত শালবন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শুধু পাঁচ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৯৬০ হেক্টর এলাকায় ব্লক বনায়নের মাধ্যমে ৪ কোটি ২০ লাখ চারা, ৩ হাজার ৭২৭ কিলোমিটার এলাকায় সারিবদ্ধ বনায়নের মাধ্যমে ৩ কোটি ২৭ লাখ চারা এবং ৪ হাজার হেক্টর এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে ১ কোটি ৭৭ লাখ চারা লাগানো হবে।
এ ছাড়া বাড়ির আঙিনায় বনায়নের জন্য আরও ৫৬ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ মিলিয়ে এক অর্থবছরেই প্রায় ১০ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গাছ লাগানোর জন্য “এক শিশু, এক গাছ” কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সরকারের পরিকল্পনা শুধু বৃক্ষরোপণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর দখল হয়ে যাওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধার করা হবে এবং সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ আরও ৩০০ হেক্টর বাড়ানো হবে।
বনায়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জিপিএস ও জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। বন বিভাগের রোপণ করা গাছের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং অ্যাপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে দেশের বিপন্ন প্রাণীর তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। নতুন মূল্যায়নের আওতায় সামুদ্রিক প্রাণীসহ প্রায় ২ হাজার ২০০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
জলবায়ু অর্থায়নের নতুন সুযোগ হিসেবে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সরকার উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশ কার্বন বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় ১১টি নতুন কার্বন বাণিজ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষি খাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ও পানির সংকট মোকাবিলায় নদীর পাশে খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং উপকূলীয় কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং তাপমাত্রা পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই কৃষিতে জলবায়ু উপযোগী প্রযুক্তি ও পদ্ধতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
প্লাস্টিক দূষণ কমাতেও নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকার বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে “চক্রাকার ভবিষ্যৎ মডেল” চালুর পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, জৈব সার তৈরি এবং প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আগামী পাঁচ বছরে ৩আর নীতি—হ্রাস, পুনঃব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।ইতোমধ্যে ১৭টি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন নির্দেশিকা তৈরির উদ্যোগ চলছে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণও সরকারের পরিবেশ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণে ১৫টি ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং ১৬টি কমপ্যাক্ট পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চালু রাখা হবে।
যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ১০টি আধুনিক যান পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড় শিল্পকারখানার নির্গমন পর্যবেক্ষণের জন্য অনলাইন নির্গমন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্য ব্যয় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশের সমান।
২০২৫ সালে অনুমোদিত ২৯০ মিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পের মাধ্যমে বায়ু পর্যবেক্ষণ, শিল্প নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং যানবাহনের দূষণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই পরিবেশগত সংকট সমাধান হবে না। গাছ লাগানোর পর সেগুলোর টিকে থাকা, বন পুনরুদ্ধার, দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এখন আর শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, বরং অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিবেশ ব্যবস্থাপনাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

