কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনিও তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। জলবায়ুজনিত এই ঘটনার প্রভাব থাকবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বাংলাদেশে এর প্রভাব কতটা পড়তে পারে এবং কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার, সে বিষয়ে ধারণা দিয়েছেন জলবায়ু ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এল নিনিও হলেই নির্দিষ্ট কোনো প্রভাব নিশ্চিতভাবে ঘটবে, এমন নয়। তবে খরা, তাপপ্রবাহ ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
এল নিনিও হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পূর্ব ও মধ্যভাগে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা। এটি সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর ঘটে এবং কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি স্থায়ী হতে পারে। স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বাণিজ্যিক বায়ু বয়ে যায়। এই বাতাস উষ্ণ পানিকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে নেয়, আর দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে নিচ থেকে ঠান্ডা পানি উঠে আসে। এল নিনিওর সময় এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে সরে আসে। এতে অঞ্চল ও ঋতুভেদে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, খরা, বন্যা ও ঝড়ের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, এবারের এল নিনিও দেড়শ বছরের মধ্যে অন্যতম ‘সুপার এল নিনিও’ হতে যাচ্ছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। ১৯৯৭-৯৮ ও ২০১৫-১৬ সালের এল নিনিওতে এই বৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৭৫ ডিগ্রি। সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনিও হয়েছিল ১৮৭৭-৭৮ সালে, তখন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৮ ডিগ্রি বেশি ছিল। এবার তার চেয়েও বেশি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।
অধ্যাপক সাইফুল বলেন, এল নিনিওর উৎপত্তি প্রশান্ত মহাসাগরে হলেও বাংলাদেশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। তবে দূরবর্তী আবহাওয়াগত যোগাযোগ বা টেলিকানেকশনের মাধ্যমে এর প্রভাব এখানে পড়তে পারে। এই যোগাযোগ ঘটে মূলত বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ ও মহাসাগরীয় স্রোতের মাধ্যমে। তাঁর ভাষ্য, অতীতেও বাংলাদেশ এভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এল নিনিওর সময় শুষ্কতা, খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বন্যা বা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি থাকবে না। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে, তাই স্বাভাবিক সময়ের প্রস্তুতিও ধরে রাখতে হবে। আগামী বছর তাপপ্রবাহ ও খরার সম্ভাবনা আছে বলেও তিনি জানান।
পরোক্ষ প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন এই অধ্যাপক। তাঁর মতে, দুর্যোগের কারণে এক খাতে ক্ষতি হলে তার ধারাবাহিক প্রভাব অন্য খাতেও পড়ে। একসঙ্গে দুটি দুর্যোগ, যেমন তাপপ্রবাহ ও খরা, দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এই প্রভাব ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ও পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হতে পারে।
বাণিজ্যের মাধ্যমেও বাংলাদেশ প্রভাবিত হতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকাসহ কয়েকটি অঞ্চলে এল নিনিওর বড় প্রভাব পড়তে পারে। কোনো বড় উৎপাদনকারী দেশে ফসলের উৎপাদন কমে গেলে ওই দেশকে বাড়তি আমদানি করতে হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অধ্যাপক সাইফুল বলেন, বর্তমান বিশ্বে কোনো প্রভাব এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এক দেশ থেকে আমদানি সম্ভব না হলে অন্য দেশ থেকে আনতে হয়, তাতে দাম বাড়তে বা সংকট দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্য ও কৃষিতেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা আছে। তাপপ্রবাহ বাড়লে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও হিট স্ট্রেস বাড়তে পারে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমলে পানিবাহিত রোগের আশঙ্কাও থাকে। শুষ্কতা বাড়লে সেচের চাহিদা বাড়বে, এতে সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামেও পড়তে পারে।

গবেষণা সংস্থা হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, এল নিনিওর প্রভাবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই প্রভাব সব অঞ্চল ও ঋতুতে একরকম নয়। ১৯৫১ থেকে ২০১৭ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে উপকূলীয় পাঁচ জেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনিওর বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের চেয়ে গড়ে প্রায় ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি বেশি ছিল। একই গবেষণায় ওই সময়ে বৃষ্টিপাতও কম পাওয়া গেছে। এতে কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও জানান, ১৯৪৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশের ৩৫টি আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এল নিনিওর সম্পর্ক সব অঞ্চল ও সময়ে একই রকম নয়। ভারত মহাসাগর ডাইপোলের সঙ্গে দেশের কিছু অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের উল্লেখযোগ্য সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ভারত মহাসাগরের এক পাশে পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ এবং অন্য পাশে তুলনামূলক ঠান্ডা হলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটিই এই ডাইপোল। মোহন কুমার দাশের মতে, বাংলাদেশের বৃষ্টিপাত বুঝতে প্রশান্ত মহাসাগরের পাশাপাশি ভারত মহাসাগরের অবস্থান ও মৌসুমি বায়ুর গতিবিধিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় ১৯৮৫ থেকে ২০২২ সালের ৩৪টি আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের প্রবণতা যথাক্রমে ৮২ দশমিক ৩৫, ৭৩ দশমিক ৫৩ ও ৫০ শতাংশ পাওয়া গেছে। মোহন কুমার দাশ বলেন, পূর্বাভাস পাওয়া গেলে আগেভাগেই কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের পরিকল্পনা, পানি সংরক্ষণ, কৃষকদের সময়োপযোগী ফসল ব্যবস্থাপনার পরামর্শ এবং তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকির প্রস্তুতি জোরদার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর ও মৌসুমি বায়ুর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শুধু একটি সূচকের ওপর নির্ভর না করে অঞ্চলভিত্তিক আবহাওয়া তথ্য, সমুদ্রের পরিস্থিতি ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস একসঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া সব সময় এল নিনিওর সঙ্গে মিলবে, এমন নয়। এল নিনিওর বছরে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক বৃষ্টি হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে বৃষ্টির পরিমাণ কম হওয়ার কথা। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হলে লা নিনা তৈরি হয়, তখন এ অঞ্চলে বৃষ্টি ভালো হয়।
তিনি মনে করিয়ে দেন, অনেকে ভাবেন এল নিনিওর বছরে বৃষ্টি কম হয়। কিন্তু ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বড় বন্যা হয়েছিল এল নিনিওর বছরেই। এল নিনিওর বছরে বৃষ্টিপাতের ধরন অনিয়মিত হয়ে যায়, কোথাও বেশি, কোথাও কম। বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি এলাকায় বেশি বৃষ্টি হলে সেই পানি ক্যাচমেন্ট এলাকায় জমে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা দিয়ে নেমে আসে। তিন নদীর পানি একই সময়ে বাড়লে বন্যার তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে এমনটি হয়েছিল। দেশের ভেতরে মৌসুমি বৃষ্টি কম হলেও উজানের বৃষ্টিতে বন্যা হয়েছে, এমন নজিরও আছে।
সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, বৃষ্টি ও বন্যার মৌসুমি পূর্বাভাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিতে পারবেন। যেমন, মার্চ, এপ্রিল বা মে মাসে খরা হতে পারে, এমন পূর্বাভাস আগে থেকে দিতে পারলে কৃষকেরা আগেভাগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, আগামী বছর সম্ভাব্য নানা দুর্যোগ মোকাবিলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা উচিত। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হতে পারে, খরা দেখা দিতে পারে, স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সরকারের পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার। তাঁর পরামর্শ, কৃষকদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জ্বালানির দাম আগেই বেড়েছে, তাই সৌরচালিত সেচ পাম্পসহ সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে যাওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। এল নিনিওর প্রভাব বাংলাদেশে একরৈখিক নয়। কোথাও খরা ও তাপপ্রবাহ, কোথাও অতিবৃষ্টি বা বন্যা, আবার সমুদ্রে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ও দেখা দিতে পারে। তাই নির্দিষ্ট একটি দুর্যোগের ওপর নজর না দিয়ে সব ধরনের ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মৌসুমি পূর্বাভাসের সক্ষমতা বাড়ানো, কৃষিতে সেচ ও পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যখাতের প্রস্তুতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন নজর থাকবে, আগামী মাসগুলোতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কত দ্রুত এসব প্রস্তুতি নেয়।

