বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা উঠলেই সাধারণত বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা পাহাড়ধসের চিত্র সামনে আসে। এসব দুর্যোগে মানুষের জীবন, জীবিকা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রাণহানির হিসাবে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ হয়ে উঠেছে বজ্রপাত। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় ধরনের দুর্যোগে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী বজ্রপাত। অথচ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগের ধরন, ক্ষয়ক্ষতি ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত, ভূমিকম্প ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি এবং আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অগ্রাধিকার তালিকায় বজ্রপাতকে প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে।
পাঁচ বছরে ছয় দুর্যোগে মৃত্যু ২,৫৩৩ জনের
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় ধরনের দুর্যোগে মোট ২ হাজার ৫৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৫৩০ জন। অর্থাৎ, মোট প্রাণহানির ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ ঘটেছে এই একটি দুর্যোগে। পরিসংখ্যানটি স্পষ্ট করে যে বজ্রপাত বাংলাদেশের জন্য শুধু মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং জননিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডে ৬৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৭ জন, পাহাড়ধসে ৯০ জন, ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন এবং ভূমিকম্পে ১০ জন। এসব পরিসংখ্যানের মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অন্য দুর্যোগগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্যোগের ভয়াবহতা শুধু তার দৃশ্যমান ধ্বংসযজ্ঞ দিয়ে বিচার করা যায় না। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি অনেক সময় বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। কিন্তু বজ্রপাতের ঘটনা সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে। মাঠে কাজ করা কৃষক, খোলা জায়গায় থাকা শ্রমজীবী মানুষ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের ওপর এর আঘাত নেমে আসে আকস্মিকভাবে। ফলে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও সম্মিলিত প্রাণহানির সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
আর্থিক ক্ষতিতে বন্যা সবার ওপরে
প্রাণহানির হিসাবে বজ্রপাত এগিয়ে থাকলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটিয়েছে বন্যা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পে মোট ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এই হিসাব থেকে দুর্যোগের দুই ধরনের প্রভাব স্পষ্ট হয়। একদিকে বজ্রপাত তুলনামূলকভাবে কম আর্থিক ক্ষতি করলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে বন্যা ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, অবকাঠামো ও জীবিকার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তাই শুধু আর্থিক ক্ষতির ভিত্তিতে দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা করলে বজ্রপাতের মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকি যথাযথ গুরুত্ব নাও পেতে পারে। কোন দুর্যোগে কত মানুষ মারা যাচ্ছেন, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং কীভাবে প্রাণহানি কমানো সম্ভব, এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
মার্চ থেকে বাড়ে বজ্রপাত, মে মাসে সর্বোচ্চ
বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি সারা বছর সমান থাকে না। মাসভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বজ্রপাতের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। মার্চ থেকে এর প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয় এবং মে মাসে বজ্রপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে তা কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বৃদ্ধি দেখা যায়।
এই মৌসুমি প্রবণতা বজ্রপাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বছরের কোন সময়ে ঝুঁকি বাড়ে, তা জানা থাকলে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, কৃষকদের সচেতন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা সহজ হয়।
বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে সতর্কতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। কৃষিকাজের মৌসুমে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় খোলা মাঠে অবস্থান করেন। আকাশে মেঘ জমলেও কাজ শেষ করার তাগিদে তাঁরা মাঠ ছাড়তে দেরি করতে পারেন। নিরাপদ আশ্রয় কাছাকাছি না থাকলে বজ্রপাতের সময় দ্রুত সরে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবেন, কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছাবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ করবেন, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি, বিপদে কৃষকেরা
বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বজ্রপাত ঘটে। তবে এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে। দেশের উত্তরাঞ্চলেও তুলনামূলকভাবে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশ কৃষক হওয়ায় বিষয়টি জীবিকা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
কৃষকেরা সাধারণত প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে কাজ করেন। জমিতে ফসল রোপণ, পরিচর্যা, ধান কাটা কিংবা ফসল ঘরে তোলার মতো কাজে সময়ের গুরুত্ব অনেক। আকাশের অবস্থা খারাপ হলেও কাজ ফেলে চলে আসা তাঁদের জন্য সব সময় সহজ নয়। এক দিনের কাজ নষ্ট হলে আয় কমতে পারে, ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলে তা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে না।
এখানেই বজ্রপাত মোকাবিলায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। যাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, সময়মতো সতর্কবার্তা এবং কাজের পরিবেশে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত কৃষিপ্রধান এলাকায় মাঠের কাছাকাছি নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে সতর্কবার্তা পেয়েও একজন কৃষকের পক্ষে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করেও কেন মৃত্যু কমানো কঠিন?
বাংলাদেশে বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০১৬ সালে। অর্থাৎ, এক দশক ধরে বিষয়টি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে স্বীকৃত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনায় মোট ১৩ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের উল্লেখ রয়েছে। তারপরও পাঁচ বছরে বজ্রপাতে ১ হাজার ৫৩০ জনের মৃত্যু দেখিয়ে দেয় যে স্বীকৃতি ও বাস্তব সুরক্ষার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারার মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু কমানোর আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাস্তব সমস্যা বুঝতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে এবং নিহতদের বড় অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি গবাদিপশুর মৃত্যুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তাঁর হিসাবে, মানুষের মৃত্যুর তুলনায় গবাদিপশুর মৃত্যু তিন থেকে চার গুণ হতে পারে। পাশাপাশি বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন।
এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, বজ্রপাত মোকাবিলাকে শুধু আবহাওয়াগত সতর্কতা বা সচেতনতামূলক প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মানুষের আর্থিক অবস্থা, কর্মক্ষেত্র, আশ্রয়ের সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের প্রাণহানি ও গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব রাখা প্রয়োজন, যাতে দুর্যোগটির প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়।
সতর্কবার্তা পেলেই কি নিরাপদ হওয়া সম্ভব?
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা তৈরির কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু সতর্কবার্তা পাওয়ার পর নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে সচেতনতার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাঠে কাজ করা মানুষের জন্য এই সমস্যা আরও প্রকট।
গওহার নঈম ওয়ারা কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কার্যালয়ের মতো স্থাপনার প্রসঙ্গ এসেছে। এসব স্থাপনায় বিদ্যমান সুরক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে কৃষকদের মাঠ ও বাড়ির নিরাপত্তা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা তিনি বলেছেন। পাশাপাশি গাছ কাটা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের আশ্রয়ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের জন্য স্থানীয় পরিস্থিতি, বজ্রপাতের ধরন এবং স্থাপনার নিরাপত্তা যাচাই করা জরুরি। শুধু কোনো স্থাপনা নির্মাণ করলেই সেটি বজ্রপাতের সময় নিরাপদ হবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। যথাযথ নকশা, সুরক্ষাব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানুষের প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া বজ্রপাতের সতর্কবার্তা এমনভাবে প্রচার করা প্রয়োজন, যাতে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও সময়মতো তা জানতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুমের আগে কৃষকদের সচেতন করা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অবস্থান সম্পর্কে জানানো এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সতর্কবার্তা কত মানুষের কাছে পৌঁছাল, তাঁরা তা বুঝতে পেরেছেন কি না এবং প্রয়োজনের সময় আশ্রয় নিতে পেরেছেন কি না, সেসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা দরকার।
আহতদের চিকিৎসা ও গবাদিপশুর সুরক্ষাও জরুরি
বজ্রপাতের ক্ষতি বলতে সাধারণত মৃত্যুর হিসাবই সামনে আসে। কিন্তু বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা এবং পরিবারের আয়ের ওপর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জরুরি চিকিৎসা পেতে দেরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে গবাদিপশুর নিরাপত্তাও উপেক্ষা করা যায় না। গ্রামীণ পরিবারের অনেকের কাছে গরু, ছাগলসহ গবাদিপশু শুধু সম্পদ নয়, বরং আয়ের উৎস ও জীবিকার অবলম্বন। এসব প্রাণী মারা গেলে পরিবারের আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। ফলে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সময় মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি পশুর মৃত্যুর হিসাবও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
দুর্যোগের প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য থাকলে কোন এলাকায় কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সহজ হয়। সেই সঙ্গে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি পরিকল্পনা করতেও সুবিধা হয়।
প্রাণহানি কমাতে প্রয়োজন মাঠকেন্দ্রিক পরিকল্পনা
পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, বজ্রপাত মোকাবিলায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, যেসব এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি, সেসব অঞ্চলে ঝুঁকি অনুযায়ী প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষক ও মাঠে কাজ করা মানুষের জন্য সহজলভ্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, বজ্রপাতের মৌসুম শুরুর আগেই সতর্কবার্তা প্রচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি নথিভুক্ত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। কোন উদ্যোগে প্রাণহানি কমছে, কোন এলাকায় সুরক্ষার ঘাটতি রয়েছে এবং কোথায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন, এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বজ্রপাতের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা। কৃষককে মাঠে যেতে নিষেধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তাঁর কাজের ধরন, জীবিকার সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ছয় ধরনের দুর্যোগে ২ হাজার ৫৩৩ জনের মৃত্যুর মধ্যে ১ হাজার ৫৩০ জনই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত। বন্যা দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করলেও বজ্রপাত কেড়ে নিচ্ছে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ। তাই প্রাণহানি কমাতে সতর্কবার্তার পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, স্থানীয় প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই স্বীকৃতিকে মানুষের জীবনে কার্যকর নিরাপত্তায় রূপান্তর করা।

