জ্বালানিসংকট কাটাতে সুন্দরবনের ভেতরের আকরাম পয়েন্ট কিংবা বন-সংলগ্ন নলিয়ান গ্রামে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের ভাবনা ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। পরিবেশ ও বনবিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের এত কাছে এমন অবকাঠামো হলে প্রতিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে এবং ইউনেসকো সুন্দরবনকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সরিয়ে নিতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোনো সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষা হবে। এর মধ্যেই আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুন্দরবন পরিদর্শনে যাচ্ছেন।
সুন্দরবনের শিবসা ও পশুর নদ যেখানে মিশেছে, সেই মোহনাই আকরাম পয়েন্ট। এর দুই কিলোমিটারের মধ্যে একদিকে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, অন্যদিকে পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। দুটিই ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ। শিবসা নদী-সংলগ্ন নলিয়ান গ্রাম সুন্দরবনের অংশ নয়, তবে সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে পড়ে। এর বিপরীতে দুই কিলোমিটারের মধ্যেও আরেকটি অভয়ারণ্য রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মোংলাকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে সুন্দরবন আগে থেকেই নানামুখী সংকটে আছে।
গত ১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে জানান, খুলনার হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। ১৯ অক্টোবর রাজধানীর এক হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফটের স্থানে টার্মিনাল করা হবে।
স্থান চিহ্নিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা কয়েক দফায় আকরাম পয়েন্ট পরিদর্শন করেছেন। ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, নৌপরিবহন, সড়ক, সেতু ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বেজা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ একটি দল বঙ্গোপসাগরের আকরাম পয়েন্ট, শিবসা নদী, সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর ঘুরে দেখে। সেদিন বিকেলে মোংলায় পৌর বিএনপির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, আকরাম পয়েন্টে ভাসমান এলএনজি স্টেশন হবে এবং সেখান থেকে ২৩ কিলোমিটার পাইপলাইনে গ্যাস মোংলায় এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এর আগে ১৪ আগস্ট ফেসবুক পোস্টে নতুন টার্মিনালের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত, শিল্পায়ন ছাড়া এ অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বেজা প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সুন্দরবনের পর্যটন, সবকিছু দেখতেই প্রধানমন্ত্রী খুলনা সফর করছেন। তাঁর ভাষ্য, কিছু করার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষা হবে, সবকিছু অনুকূল থাকলেই কেবল এসব নিয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি হবে, তার আগে নয়।
এ বিষয়ে বন অধিদপ্তরকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে জানা গেছে। অথচ সুন্দরবন সংরক্ষণের আইনি কর্তৃপক্ষ এই অধিদপ্তরই। প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, টার্মিনাল নির্মাণ নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কিছু জানানো হয়নি; এর বাইরে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জেনে খুলনা বন সংরক্ষকের কার্যালয় বন অধিদপ্তরে উদ্বেগ জানিয়ে সম্প্রতি একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, আকরাম পয়েন্টে টার্মিনাল হলে ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুতন্ত্র, উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের ওপর ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। জাহাজ চলাচলের জন্য নিয়মিত খনন করতে হলে নদীর তলদেশে জমা ভারী ধাতু পানিতে মিশবে এবং ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল পলির নিচে চাপা পড়বে। এতে সুন্দরী, গরান ও গেওয়া গাছ শ্বাস নিতে না পেরে মারা যেতে পারে। জাহাজ থেকে পড়া পোড়া তেল ও রাসায়নিক বর্জ্য বনের মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে চারা জন্মানোর প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বিশাল এলএনজি ট্যাংকার চলাচলের শব্দ ও কম্পনে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিন আবাস হারাবে, প্রপেলারের আঘাতেও মারা পড়তে পারে। এলএনজি গ্যাসে রূপান্তরের সময় প্রচুর ঠান্ডা বা গরম পানি নদীতে ফেলতে হলে পানির তাপমাত্রা বদলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হবে, নষ্ট হবে মাছের ডিম ও পোনা। নির্মাণকাজ, কৃত্রিম আলো ও শিল্পকর্মকাণ্ডে বাঘ, চিত্রা হরিণ ও বন্যশূকরের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হবে। পরিযায়ী পাখি ও উভচর প্রাণীর আবাস কাদাচরও নষ্ট হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বনবিশেষজ্ঞ বলেন, প্রচলিত ওপেন কাট পদ্ধতিতে পাইপলাইন বসালে মাটির গভীরে থাকা শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রচুর গাছ মারা যাবে। বিকল্প হলো শিকড়ের নিচ দিয়ে পাইপলাইন নেওয়া, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল; ব্যয় সংকোচনের কারণে সরকার সে পথে যাবে না বলে তাঁর ধারণা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ বলেন, বনের মধ্যে কিছু করলে প্রভাব পড়বেই, তাই সুন্দরবন বিশ্ব-ঐতিহ্য হওয়ায় সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। গ্যাস দাহ্য পদার্থ হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আর আগেও জাহাজ থেকে তেল নিঃসরণের ঘটনা ঘটেছে। জাহাজ চলাচল বাড়লে দূষণও বাড়বে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি স্পর্শকাতর। ২০১৪ সাল থেকে ইউনেসকো সুন্দরবনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সর্বশেষ বিশ্ব-ঐতিহ্য কমিটির সভা হয় গত ২১ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের খসড়া প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের ইউনেসকো-আইইউসিএন যৌথ মিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়। সুন্দরবনসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রস্তুত করা হলেও সুন্দরবন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা না করায় বাংলাদেশের সমালোচনা করে সংস্থাটি। সুন্দরবনের আশপাশে বৃহৎ শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্তে বিশ্ব-ঐতিহ্যের নির্দেশিকা মেনে চলার কথাও বলা হয়। বাংলাদেশকে ২০২৭ সালের ১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংরক্ষণ অবস্থার প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও আজারবাইজানের প্রস্তাবে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ অক্টোবর বাকুতে আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেহুন বাইরামভের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাক্ষাতে আজারবাইজান বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ জানিয়েছে।
অতীত অভিজ্ঞতাও সতর্কবার্তা দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করে ইউনেসকো, একপর্যায়ে সুন্দরবনকে ঝুঁকির তালিকায় রাখার বিষয়টি বিবেচনা করে। ২০১৪ সালে দোহায় কমিটির ৩৮তম সভায় পরোক্ষ প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ২০১৬ সালের ২২ থেকে ২৮ মার্চ যৌথ পর্যবেক্ষক দল সুন্দরবন পরিদর্শন করে এবং ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত মূল্যায়নে রামপালকে গুরুতর হুমকি আখ্যা দিয়ে প্রকল্প অন্যত্র সরানোর সুপারিশ করে। সরকার তখন তথ্য-উপাত্ত দিতে রাজি হলেও কেন্দ্র সরাতে অনড় ছিল। ২০১৮ সালে কৌশলগত সমীক্ষার আগে শিল্পকারখানার অনুমোদন না দিতে সরকারকে সতর্ক করা হয়।
সব মিলিয়ে বিষয়টি উন্নয়ন ও সংরক্ষণের পুরোনো দ্বন্দ্বকে আবার সামনে এনেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তার যুক্তি যেমন আছে, তেমনি সুন্দরবনের বিশ্ব-ঐতিহ্য মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিও বাস্তব। বন অধিদপ্তরকে না জানিয়ে স্থান পরিদর্শন এবং সমীক্ষার আগেই প্রকাশ্য ঘোষণা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত সমীক্ষা, বন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত এবং বিকল্প স্থান বিবেচনার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কোন পথে যায়।

