একসময় রাজধানীর স্বস্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল হাতিরঝিল। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকায় গড়া সেই জলাধারের পানি এখন কালচে, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ আশপাশের মানুষ। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বছরের পর বছর জমে থাকা পয়োবর্জ্য আর বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়ের কারণে লেকে ক্ষতিকর গ্যাসও তৈরি হচ্ছে।
লেকের পানি কালচে ও ময়লায় ভরা। সোনারগাঁও, মগবাজার, রামপুরা ও মহানগর অংশে তীব্র গন্ধ। পাড় দিয়ে হাঁটতে গিয়ে অনেককে নাক-মুখ চেপে রাখতে দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান, গন্ধের কারণে লেকে মানুষের আসা ও সময় কাটানো কমে গেছে। মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আলমাস সরকার বলেন, আগে নিয়মিত হাঁটতে এলেও এখন খুব কমই আসেন, কারণ সেখানে থাকার মতো পরিবেশ নেই। মহানগর আবাসিক এলাকার তাসলিমা আক্তার জানান, গন্ধ এখন বাসার ভেতরেও ঢুকে পড়ছে, ভাড়াটিয়াদের অনেকে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন।
নগর বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও কেবল শীতে দুর্গন্ধ বাড়ত, কিন্তু গত দুই বছর ধরে প্রায় সারা বছরই সমস্যা থাকছে। ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানী লেকও দূষণের শিকার, তবে সেখানে গন্ধ এখনো হাতিরঝিলের মতো অসহনীয় হয়নি।
উদ্বোধনের পর ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করত সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এসডব্লিউও)। ২০২১ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে সরকার স্থায়ী মালিক হিসেবে রাজউককে দায়িত্ব দেয়, আর সে বছরের জুলাই থেকে সংস্থাটি এটি দেখভাল করছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজউকের হাতে যাওয়ার পর থেকেই লেকের পরিবেশ ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। আগে দুর্গন্ধ ঠেকাতে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার হতো এবং লেকের তলদেশে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল, পরে সেগুলোর ধারাবাহিকতা রাখা হয়নি। পাশাপাশি আশপাশের এলাকা থেকে পয়োবর্জ্য লেকে ঢোকায় দূষণ আরও বেড়েছে।
হাতিরঝিলের নকশা ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ভিত্তি স্থপতির প্রধান নির্বাহী ইকবাল হাবিব বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লেকটি এখন ইউট্রোফিকেশন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এর জন্য পুরোপুরি রাজউক দায়ী। তার ভাষ্য, প্রায় দেড় বছর আগে রাজউক দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় জানতে বৈঠক ডাকে। লেক নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা প্রায় দেড় মাস কাজ করে বিনা পারিশ্রমিকে একগুচ্ছ সুপারিশ দেন। মূল সুপারিশ ছিল, লেকে কোনোভাবেই পয়োবর্জ্য ফেলা যাবে না; দুই পাশের বড় পাইপের মাধ্যমে সেই বর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া পানি পরিশোধন ও বাস্তুতন্ত্র ফেরানোর নির্দিষ্ট পরামর্শও ছিল। কিন্তু দেড় বছরেও রাজউক এসব বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার জানান, পয়োবর্জ্য হাতিরঝিলের দূষণের অন্যতম উৎস। এসব বর্জ্য দীর্ঘদিন জমে থাকলে জৈব পদার্থ পচে মিথেনের মতো গ্যাস তৈরি হতে পারে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, লেকে পয়োবর্জ্য ঢোকা বন্ধ করা ও জমে থাকা দূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হাতিরঝিল ফেরানো কঠিন। শুধু পানি পরিষ্কার করলে হবে না, দূষণের উৎস বন্ধ করে স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রও ফিরিয়ে আনতে হবে; নইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এদিকে দূষণের দায় নিয়ে একে অপরকে দুষছে রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুজাফফর উদ্দিন বলেন, পয়োবর্জ্য যেন লেকে না যায়, তা নিশ্চিত করা ওয়াসার কাজ। তাঁর দাবি, বৃষ্টির সময় লেকের দুই পাশের বিশেষ পয়োনিষ্কাশন পাইপ (এসএসডি) ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। তখন পান্থপথ, ধানমন্ডিসহ আশপাশের জলাবদ্ধতা কমাতে বর্জ্য ও পানি সরাসরি লেকে ছেড়ে দিতে হয়। এভাবেই লেকটি ধীরে ধীরে দুর্গন্ধময় হয়েছে। রাজউকের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কারণে সোনারগাঁও অংশের ডিফিউজার চালানো যাচ্ছে না, ফলে ওই অংশে অক্সিজেন সরবরাহ ও পানি পরিশোধন ব্যাহত হচ্ছে।
সাময়িক সমাধান হিসেবে মুজাফফর উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। বৃষ্টি থামলেই জরুরি ভিত্তিতে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হবে, যাতে গন্ধ অনেকটা কমে। এসএসডি লাইনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে ওয়াসাকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ওয়াসা সম্মতি দিয়েছে এবং আলাদা প্রকল্প নেওয়ার কথা জানিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ওয়াসা দায় নিতে নারাজ। সংস্থাটির উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, হাতিরঝিলে ওয়াসার কোনো পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক নেই; এসএসডি নেটওয়ার্ক রাজউকের তত্ত্বাবধানে। এই নেটওয়ার্ক দিয়ে রামপুরা লিফটিং স্টেশন পর্যন্ত বর্জ্য পৌঁছানো রাজউকের দায়িত্ব। সেখান থেকে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে নিয়ে শোধন করে নদীতে ফেলা ওয়াসার কাজ। তাঁর ধারণা, রাজউকের এসএসডি লাইনের কোথাও লিকেজ আছে এবং সেখান থেকেই বর্জ্য লেকে ছড়িয়ে দুর্গন্ধ তৈরি করছে।
দুই সংস্থার এই দায় ঠেলাঠেলির মধ্যেই হাতিরঝিলে দূষণ বাড়ছে, আর ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী।
সূত্র: বণিক বার্তা

