দেশের জনপ্রিয় খাবার শুঁটকিতে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। উপকূলীয় চার এলাকা থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি নমুনাতেই এসব কণার উপস্থিতি পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। লইট্টা, ছুরি, পোয়া ও ফাইস্যা মাছের পাশাপাশি বাগদা ও হরিণা চিংড়ির শুঁটকিও এর বাইরে নয়।
গবেষণাটি গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী মেরিন পলিউশন বুলেটিনে অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। এলসেভিয়ার প্রকাশিত এই সাময়িকীতে বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনার পর সামুদ্রিক দূষণ-সংক্রান্ত গবেষণা ছাপা হয়। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান।
গবেষকেরা সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফে শুঁটকি তৈরির স্থান থেকে ছয় প্রজাতির শুঁটকির নমুনা নেন। মোট ২৪টি নমুনার প্রতিটি থেকে ১০ গ্রাম শুকনা অংশ পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে প্রতি গ্রাম শুঁটকিতে ০.২৫ থেকে ১.৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
সর্বোচ্চ ১.৩০টি কণা মিলেছে দুবলার চরের লইট্টা শুঁটকিতে। দ্বিতীয় অবস্থানে কক্সবাজারের বাগদা চিংড়ি, যেখানে কণার পরিমাণ ১.২৫টি। সুন্দরবনের পোয়ায় ০.৯০, বাগদায় ০.৮০ ও ছুরিতে ০.৬৫টি কণা পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের পোয়ায় ০.৭০ ও ছুরিতে ০.৫০টি, টেকনাফের লইট্টায় ০.৭৫, ফাইস্যায় ০.৭০ ও হরিণা চিংড়িতে ০.২৫টি এবং কুয়াকাটার ফাইস্যায় ০.৬৫ ও হরিণা চিংড়িতে ০.৫০টি কণা মিলেছে।
এলাকাভিত্তিক গড়ে শীর্ষে সুন্দরবনে ০.৯১, এরপর কক্সবাজারে ০.৮২, কুয়াকাটায় ০.৫৮ ও টেকনাফ ০.৫৭। তবে এই ব্যবধান পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তাই কোনো এলাকার শুঁটকি নিশ্চিতভাবে বেশি দূষিত, এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় সাত ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলিথিন ৩০.৪৯ শতাংশ ও পলিপ্রোপিলিন ২৪.৩৯ শতাংশ। বাকিগুলোর মধ্যে আছে পলিয়েস্টার, পলিস্টাইরিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইড। ব্যাগ, মোড়ক, দড়ি ও পোশাকসহ নানা পণ্যে এসব প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। বেশির ভাগ কণা সূক্ষ্ম সুতার মতো, কিছু ছোট ভাঙা টুকরাও আছে। কণাগুলোর বড় অংশের আকার ১৫১ থেকে ১ হাজার ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে। রঙের দিক থেকে নীল ও কালো কণাই বেশি।
প্লাস্টিকের ধরন ও রাসায়নিক বিপদ মান বিবেচনায় গবেষকেরা একটি ঝুঁকিসূচক তৈরি করেছেন। এতে সর্বোচ্চ মান কুয়াকাটার ২ হাজার ৬৪২.৭। এরপর কক্সবাজার ১ হাজার ৪৬১.১, টেকনাফ ১২০.৫ ও সুন্দরবন ৮৬.৭। অর্থাৎ কণার সংখ্যায় সুন্দরবন এগিয়ে থাকলেও রাসায়নিক ঝুঁকিতে শীর্ষে কুয়াকাটা। কারণ, কুয়াকাটা ও কক্সবাজারের নমুনায় তুলনামূলক বেশি বিপজ্জনক পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিস্টাইরিন পাওয়া গেছে।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,অধ্যাপক আশরাফুল আজম খান বলেন, শুধু কণার সংখ্যা দিয়ে ঝুঁকি বোঝা যায় না, কোন ধরনের প্লাস্টিক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, শুঁটকি খেলে শরীরে প্লাস্টিক কণা ঢোকার আশঙ্কা আছে। তবে সেগুলো শরীরে জমে কি না বা দীর্ঘ মেয়াদে কী প্রভাব ফেলে, তা এই গবেষণায় যাচাই করা হয়নি।
গবেষকদের ধারণা, দুই পর্যায়ে শুঁটকিতে প্লাস্টিক মিশতে পারে। প্রথমত, সমুদ্রে থাকাকালে মাছ পানি ও খাবারের সঙ্গে কণা গ্রহণ করে। দ্বিতীয়ত, ধরার পর শুকানো, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও কণা যুক্ত হতে পারে। নদী-সাগরের প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে যাওয়া, জাল ও দড়ির ক্ষয়, বাতাসে ভেসে আসা কণা এবং মাছ শুকানোর কাজে ব্যবহৃত পুরোনো পলিথিন চাদর বা ত্রিপল সবই উৎস হতে পারে। তবে কোন ধাপে কতটা মিশেছে, তা এই গবেষণায় নির্ণয় করা যায়নি।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৫১ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় ১৫ শতাংশ শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। উপকূলীয় এলাকা থেকে শুঁটকি সারা দেশে যায়, রপ্তানিও হয় বিদেশে। শুঁটকি মূলত রোদে শুকিয়ে তৈরি হয়। মাছ বাছাই ও পরিষ্কার করে বাঁশের মাচা, চাটাই বা খোলা জায়গায় শুকাতে সাধারণত তিন থেকে সাত দিন লাগে। এ সময় মাছ বাতাস, ধুলাবালু ও নানা সরঞ্জামের সংস্পর্শে আসে।
দূষণ কমাতে পরিষ্কার ও উঁচু মাচায় মাছ শুকানো, পুরোনো প্লাস্টিকের চাদর, জাল ও দড়ি এড়িয়ে চলা এবং মাছ ধোয়ার পানি, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক আশরাফুল। তার মতে, শুকানোর আগে ও পরে একই মাছ পরীক্ষা করে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা জরুরি। এর জন্য সরকারি নজরদারি, উৎপাদনকারীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত শুকানো-ব্যবস্থা দরকার। স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন হলেও সেই অপেক্ষায় না থেকে এখনই দূষণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন

