জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে উচ্চ তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু গত তিন দশকে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। একটি নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় এ ধরনের মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় ১২৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সঙ্গে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে দেশের অর্থনীতিকে প্রতিবছর প্রায় ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের আয়োজনে জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহনশীলতা শীর্ষক এক নীতি-সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যগত প্রভাব শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন নলেজ হাবের প্রেসিডেন্ট খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে দেশে উচ্চ তাপমাত্রাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছিল ৬ হাজার ৯৮২ জনের। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৮১ জনে। অর্থাৎ তিন দশকে এ কারণে অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় আট হাজার ৯৯৯ জনের। নিম্ন তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর চিত্রও ভালো নয়। ১৯৯০ সালে এ কারণে মৃত্যু ছিল ৩ হাজার ৫৪৬ জন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৪২৭ জন। এ হিসাবে তিন দশকে মৃত্যু বেড়েছে ৮ হাজার ৮৮১ জন। তবে এর মধ্যে কিছুটা স্বস্তির তথ্যও আছে। একই সময়ে ডায়রিয়া ও ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু কমেছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশের জন্য দায়ী অতিরিক্ত তাপ। তাপপ্রবাহের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে এবং ডেঙ্গুসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিচ্ছে। এসব মিলিয়ে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় উদ্বেগজনকভাবে কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কর্মঘণ্টা হারানোর হিসাবটি অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপের কারণে দেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। হারানো কর্মঘণ্টার প্রায় ৬৪ শতাংশই কৃষি খাতের। অর্থাৎ যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, সেই কৃষকেরাই তাপের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাচ্ছেন।
বায়ুদূষণও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালে দেশে বার্ষিক গড় পিএম২.৫-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৮ মাইক্রোগ্রাম। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার প্রায় ১৫ গুণ।
ডেঙ্গু নিয়েও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেশে ডেঙ্গুতে ২০২৩ সালে মারা গেছেন ১ হাজার ৭০৫ জন, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১২ জন। মৃত্যু কমলেও ঝুঁকি কমেনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঢাকার বাইরের হলেও মৃত্যুর ৫৭ থেকে ৬৪ শতাংশ ঘটে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। এতে বোঝা যায়, ঢাকার বাইরের হাসপাতালে সক্ষমতার ঘাটতির কারণে গুরুতর রোগীদের অনেককে শেষ মুহূর্তে রাজধানীতে আনা হয়।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ডেঙ্গু এখন জাতীয় রোগে পরিণত হয়েছে। তাঁর হিসাবে, উষ্ণ মাসে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর ডেঙ্গুতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২১ থেকে ২৪ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে ডেঙ্গুর আগাম সতর্কতা পাওয়া সম্ভব। হাসপাতালগুলোকে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো যাবে বলে তিনি জানান।
সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিবেদনে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র গরমে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে হিট হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সুরক্ষা নির্দেশিকা চালু করা। পাশাপাশি ডেঙ্গুর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু, ঢাকার বাইরের হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আবহাওয়া ও স্বাস্থ্য তথ্যের সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির প্রশ্ন। তাপপ্রবাহ বাড়লে একদিকে মানুষের প্রাণহানি বাড়ে, অন্যদিকে কৃষিসহ উৎপাদনশীল খাতে কর্মক্ষমতা কমে যায়। বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো না গেলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই আগাম সতর্কতা, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং শ্রমিক সুরক্ষার মতো কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

