দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ২০২৪ সালে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের (কেএইচআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তাপপ্রবাহের কারণেই।
গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘মাল্টি-ডাইমেনশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ: পাথওয়েজ, কস্টস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এমএ মুহিত।
প্রতিবেদনের হিসাবে, তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশে বছরে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০ কোটি ডলার। এটি ২০২৪ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় বোঝা হয়ে উঠছে।
অতিরিক্ত গরমে মানুষের শারীরিক পরিশ্রমের সক্ষমতা কমে যায়। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং উৎপাদনশীলতা কমে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ক্ষতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের সঙ্গে যুক্ত। খোলা মাঠে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় বলে তাঁরা তাপের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন। ফলে তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কৃষি উৎপাদন, শ্রমজীবী মানুষের আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন-সংবেদনশীল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে দেশে বছরে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। তাঁর মতে, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য, দুই ক্ষেত্রেই এ ক্ষতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০-এর দশকের তুলনায় ২০২০-এর দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতাও বাড়ছে। এতে ঘামের মাধ্যমে শরীরের বাড়তি তাপ বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধা পাচ্ছে। ফলে হিট স্ট্রোকসহ তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে হৃদযন্ত্র, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাবের ভয়াবহতাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মডেলভিত্তিক হিসাবে ২০২৩ সালে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আছে হৃদরোগ, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের নানা অসুস্থতাজনিত মৃত্যু। অতিরিক্ত গরমের দিনে ডায়রিয়া ও তাপজনিত অবসাদের প্রকোপও বাড়তে দেখা গেছে। এ ছাড়া শীতের তুলনায় গ্রীষ্মকালে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মাত্রা বেশি থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের আরেকটি হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মোট ক্ষতির মধ্যে বছরে প্রায় ১০০ কোটি থেকে ৩৩০ কোটি ডলার সরাসরি তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই হিসাবে বায়ুদূষণ এবং প্রাণঘাতী নয় এমন অসুস্থতার ব্যয় ধরা হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।
তাপপ্রবাহের পাশাপাশি ডেঙ্গুও জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। দেশের সব জেলার ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির তথ্য এবং আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। তাতে দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার দুই-তিন সপ্তাহ পর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা আছে। আগের চার সপ্তাহে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে দুই সপ্তাহ পর ডেঙ্গুতে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে গড়ে ৪১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮২৪টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এতে দুর্যোগের সময় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ে।
এত বড় ক্ষতির পরও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় দেশে সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা নেই। তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না, আর সেই চিত্র অস্পষ্ট থাকলে নীতিনির্ধারণও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এসব ঝুঁকি থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও অন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার, গবেষণা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। গবেষণার প্রমাণ কাজে লাগিয়ে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বাড়তি জলবায়ু অর্থায়নের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালো দাবি তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের গরমের মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তার সঙ্গে হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্দিষ্ট করণীয় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
হাতে সময় আছে প্রায় চার-পাঁচ মাস। এই সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা তৈরি ও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তা না হলে আগামী গ্রীষ্মেও কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে একই ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।

