অনেক সময়ই আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনে অন্যকে ব্ল্যাঙ্ক চেক বা ফাঁকা চেক দিয়ে থাকি কিন্তু সামান্য এই অসাবধানতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়া মানে নিজের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।
ব্ল্যাঙ্ক চেকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এতে যেকোনো অঙ্ক বসানো সম্ভব। চেকে শুধু স্বাক্ষর থাকলে যার হাতে চেকটি যাবে, সে নিজের ইচ্ছামতো বড় অঙ্ক লিখে ব্যাংকে জমা দিতে পারে। এতে আপনার সম্মতি ছাড়াই বিপুল অর্থ উত্তোলনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের Negotiable Instruments Act, 1881 অনুযায়ী চেক ডিজঅনার হলে ফৌজদারি মামলা হতে পারে। ব্ল্যাঙ্ক চেকের ক্ষেত্রে পরে কেউ ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে মামলা করলে আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় “আমি এই টাকা লিখিনি”—এ কথা বললেও স্বাক্ষর থাকায় তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়।
ব্ল্যাঙ্ক চেক অনেক সময় কাছের মানুষ বা পরিচিতদের কাছেও দেওয়া হয়। কিন্তু সম্পর্কের পরিবর্তন বা বিরোধ তৈরি হলে সেই একই চেক ব্যবহার করে আর্থিক ক্ষতি করার সুযোগ থেকে যায়।
ব্যাংক সাধারণত শুধু স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখে। স্বাক্ষর ঠিক থাকলে চেকের অর্থ পরিশোধ করা হয়। কে কত টাকা লিখেছে বা কেন লিখেছে—তা ব্যাংক সাধারণত যাচাই করে না। ফলে ভুল ব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। চেক হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে সেটি সহজেই প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এটি আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে।
খুলনার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে এমনই একটি ঘটনা ঘটে। তিনি স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে জামানত হিসেবে একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক দেন। পরবর্তীতে তিনি সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ করলেও ওই চেক ফেরত পাননি। কিছুদিন পর ঋণদাতা সেই চেকে ১৫ লাখ টাকা লিখে ব্যাংকে জমা দেন। অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়। এরপর Negotiable Instruments Act, 1881 অনুযায়ী মামলা করা হয়। ফলে ওই ব্যবসায়ীকে নোটিশ, আদালতে হাজিরা, মানসিক চাপ এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সতর্কতা মানলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব—
- কোনো অবস্থাতেই ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করবেন না
- চেক দিলে নির্দিষ্ট অঙ্ক অবশ্যই লিখে দিন
- প্রাপকের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন
- প্রয়োজনে “Account Payee Only” লিখে দিন
- বড় লেনদেনে ব্যাংক ট্রান্সফার বা পে-অর্ডার ব্যবহার করুন
- চেক হস্তান্তরের সময় লিখিত রসিদ বা চুক্তি রাখুন
ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়া মানে নিজের আর্থিক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় অংশ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। সামান্য অসতর্কতা ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে ফাঁকা চেক দেওয়া থেকে বিরত থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত।
- লেখক: রিয়াজুল হক, অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

