নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ—এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের বিচারব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। একই সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামির খালাস পাওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এমন চিত্র, যা স্পষ্টভাবে দেখায়—সমস্যা আইনের ঘাটতিতে নয়, বরং তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের দুর্বলতায়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী একটি মামলা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে গড়ে সময় লাগছে প্রায় সাড়ে তিন বছর। এ সময়ের মধ্যে প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ে। এতে বিচারপ্রার্থীরা শুধু মানসিক চাপেই পড়ছেন না, আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। গবেষণায় বিচার বিলম্বের যেসব কারণ উঠে এসেছে, সেগুলো নতুন নয়। বরং দীর্ঘদিনের পরিচিত সংকট। এর মধ্যে রয়েছে—
- সাক্ষীর অনুপস্থিতি
- বারবার সময় প্রার্থনা
- তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা
- দুর্বল প্রমাণব্যবস্থা
- সাক্ষী সুরক্ষার অভাব
এই সমস্যাগুলো বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন থেকেই যায়—এগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ কেন দেখা যাচ্ছে না? আইনমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় বাজেটে এর বরাদ্দ কম হওয়ায় বিচারকদের বেতন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি সংযোজন সীমিত হয়ে আছে।
ফলে মামলার জট কমানো কিংবা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ন্যায়বিচারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে, তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি।
শুধু বাজেট বাড়ালেই সমস্যা সমাধান হবে না। তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও আদালতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব মামলার মান দুর্বল করে দিচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলায় ফরেনসিক পরীক্ষা, মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য গ্রহণে দেরি বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
কম সাজার হার দেখে অনেকেই এসব মামলাকে ‘মিথ্যা’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু এটি বাস্তবতার সরলীকরণ। প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। নারীর ওপর সহিংসতার বড় একটি অংশই আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগই করেন না।
যাঁরা মামলা করেন, তাঁদেরও অনেকে শেষ পর্যন্ত চাপের কারণে এগিয়ে যেতে পারেন না। এতে প্রমাণ দুর্বল হয়, সাক্ষী অনুপস্থিত থাকে এবং খালাসের হার বেড়ে যায়।
পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। অধিকাংশ ঘটনা ঘরের ভেতরে ঘটে, যেখানে বাইরের সাক্ষী পাওয়া কঠিন। ফলে প্রমাণ সংগ্রহ এবং মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতায় বিচারকদের আরও সংবেদনশীল ও প্রেক্ষাপটভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সাক্ষী সুরক্ষা এবং আইনি সহায়তা জোরদার করাও অপরিহার্য।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা: বিশ্লেষণে স্পষ্ট, একটি সমন্বিত সংস্কার ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বিচার বিভাগের বাজেট ও জনবল বৃদ্ধি
- তদন্ত ও সাক্ষ্য গ্রহণে প্রযুক্তির ব্যবহার
- মামলার ধীরগতি কমানো
- সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর বাস্তবায়ন
- ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা শক্তিশালী করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বর্তমান চিত্র শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাই নয়, বরং ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি সামাজিক আস্থারও পরীক্ষা। আইন থাকা সত্ত্বেও যদি তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হয়, তবে তা ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুবই সরল, কিন্তু উত্তরটা জটিল। আইন আছে, আদালত আছে, বিচারব্যবস্থাও আছে—তবু যদি ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের বদলে বছরের পর বছর অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর হতাশা পায়, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে কতটা কার্যকর বলা যায়?
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার কম হওয়া কিংবা খালাসের হার বেশি হওয়া শুধু আদালতের ভেতরের বিষয় নয়; এটি সমাজ, তদন্তব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের সম্মিলিত চিত্র। প্রতিটি ধীরগতি মামলা শুধু একটি ফাইল নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং বিশ্বাস।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এখানেই—ন্যায়বিচার কি কেবল কাগজে লেখা একটি প্রতিশ্রুতি, নাকি বাস্তবে পৌঁছানোর একটি নিশ্চিত পথ? এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন স্পষ্ট না হবে, ততদিন পরিসংখ্যান বদলালেও বাস্তবতা বদলাবে না।
সিভি/এম

