কারাগারের ভেতরে স্বাভাবিক চলাফেরা, প্রিজনভ্যানে ওঠা-নামায় কোনো দৃশ্যমান অসুবিধা নেই—তবু ট্রাইব্যুনালে হাজিরার দিন সামনে আসে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগের দাবি। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার একাধিক আসামির এমন স্বাস্থ্য প্রতিবেদন এখন নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থতার কথা বলে বিশেষ সুবিধা বা জামিনের চেষ্টা করা হলেও জমা দেওয়া চিকিৎসা নথির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও রোগের বর্ণনার সঙ্গে হাসপাতালের প্রতিবেদনের অসামঞ্জস্য, আবার কোথাও জেলহাজতে থাকার সময়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিদেশি হাসপাতালের কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে।
তাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতেই কয়েকজন আসামি অসুস্থতাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে আসামিপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, চিকিৎসা নথি যথাযথ এবং উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনেই আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই—অসুস্থতা কি বাস্তব, নাকি বিচার এড়ানোর নতুন কৌশল? এই বিতর্কই ঘুরপাক খাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালপাড়ায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ একাধিক শীর্ষ নেতা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আসামি বিভিন্ন জটিল রোগের কথা উল্লেখ করে জামিনসহ বিশেষ সুবিধা চাওয়ার আবেদন করছেন। এ তালিকায় রয়েছেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী। তারা ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২–এ নিজেদের নিয়োজিত আইনজীবীদের মাধ্যমে এসব আবেদন দাখিল করেছেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে, এসব আসামি কারাগারে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলেও আদালতে হাজিরার সময় হঠাৎ গুরুতর রোগের তথ্য সামনে আনা হচ্ছে, যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় কামরুল ইসলাম ও এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর নাম। তারা ক্যানসার ও লিভার সিরোসিসের মতো জটিল রোগের অজুহাতে জামিন বা বিশেষ চিকিৎসা সুবিধা চেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ‘পাকস্থলীর ক্যানসার’ (গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার) আক্রান্ত দাবি করে বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে চিকিৎসার অনুমতি পান কামরুল ইসলাম। গত ৯ এপ্রিল এই আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। তবে চিকিৎসা নথি যাচাই করতে গিয়ে একাধিক অসংগতি পাওয়ার দাবি করে আদেশটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করে প্রসিকিউশন। গত ৩০ এপ্রিল এ বিষয়ে দীর্ঘ শুনানি হয়। শুনানির পর আগের আদেশ স্থগিত করে আদালত আসামিপক্ষকে নথির উৎস ও সত্যতা ব্যাখ্যা করতে ১৫ দিনের সময় দেন। এ ঘটনায় এখন ট্রাইব্যুনালপাড়ায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে চিকিৎসা প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা ও বিচার প্রক্রিয়ার গতি।
চলতি বছরের ১২ ও ১৫ ফেব্রুয়ারিতে কামরুল ইসলামের পক্ষে দুটি চিকিৎসা প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন তার আইনজীবীরা। এর মধ্যে একটি প্রতিবেদন কামরাঙ্গীরচরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসকের নামে এবং অন্যটি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালের নামে প্রস্তুত।
তবে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে তিনি কারাগারে আটক থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—এই সময়ে বিদেশি হাসপাতালের চিকিৎসা নথি কীভাবে সংগ্রহ হলো এবং কোন প্রক্রিয়ায় ওইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হলো। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখিত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ধরন নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে প্রসিকিউশন। তাদের বক্তব্য, রোগীকে সরাসরি পরীক্ষা না করেই বা চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ছাড়া কীভাবে এসব প্রতিবেদন তৈরি হলো, তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
এদিকে কামরুল ইসলাম ছাড়াও একই ধরনের চিকিৎসাজনিত আবেদন ঘিরে আলোচনায় এসেছেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী। ‘লিভার সিরোসিসে’ আক্রান্ত দাবি করে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি তিনি জুলাই হত্যা মামলায় শর্তসাপেক্ষে জামিন পান। তবে তথ্য গোপনের অভিযোগ ওঠায় পরে তার মুক্তি কার্যকর হয়নি এবং জামিনও স্থগিত হয়।
গত ৪ মে তার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল-২ এ দীর্ঘ শুনানি হয়। আদালতের নির্দেশে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও সেখানে রোগ নির্ণয়ে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত শুনানি আগামী ১১ মে নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন তার জামিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে।
অন্যদিকে শাপলা চত্বরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল হৃদরোগে আক্রান্ত বলে জামিন চেয়েছেন। ৬ মে ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. আলী হায়দার। তবে স্বাস্থ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল তার অবস্থা সংকটাপন্ন নয় বলে উল্লেখ করে আবেদন বিবেচনায় নেয়নি।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালে হাজিরার দিনগুলোতেই আসামিদের অসুস্থতার বিষয় সামনে আনা হচ্ছে, যা এখন একটি নিয়মিত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। তাদের দাবি, কামরুল ইসলামের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের যে নথি জমা দেওয়া হয়েছে, তা তিনি কারাবন্দি অবস্থায় থাকা সময়ের, যা প্রশ্ন তৈরি করছে। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে সন্দেহজনক বা ভুয়া নথি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে সংঘটিত একটি মামলায় ফজলে করিমসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। ৩ মে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ওই দিন ফজলে করিমকে সার্ভাইক্যাল কলার পরা অবস্থায় দেখা গেলেও আদালতে শুনানি শুরুর পর তার আইনজীবীরা অসুস্থতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তার আইনজীবীদের দাবি, ১৯ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেওয়ার পথে তিনি আহত হন এবং পরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি) এমআরআই পরীক্ষা করানো হয়। বয়সজনিত ঝুঁকি ও শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে তার পক্ষ থেকে বিশেষ চিকিৎসার আবেদনও জানানো হয়েছে।
কারাগার সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারের আওতায় থাকা বন্দিদের মধ্যে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী এবং সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। একই ব্যবস্থাপনায় সাবেক আইজিপি শহীদুল হক রয়েছেন বিশেষ কারাগারে। আর কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল।
কারা বিধি অনুযায়ী, বন্দিরা হঠাৎ অসুস্থ হলে প্রথমে কারা হাসপাতালেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি বা জটিল রোগ হলে তাদের পাঠানো হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারের এক কর্মকর্তা জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালে এসব আসামির পক্ষে যেসব জটিল রোগের কথা বলা হচ্ছে, তা কারা কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে ততটা গুরুতর হিসেবে ধরা পড়েনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বয়সজনিত কিছু সাধারণ শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে, তবে যেভাবে গুরুতর রোগ দেখিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বাস্তব অবস্থায় তা অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়। তার দাবি, বিশেষ সুবিধা বা জামিন পাওয়ার উদ্দেশ্যে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাড়িয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন কামরুল ইসলামের আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী। তার বক্তব্য, চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো ভুয়া বা জাল কাগজ আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য ট্রাইব্যুনাল তাদের ১৫ দিনের সময় দিয়েছে, যার মধ্যে সব ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এই সময়ের মধ্যে কামরুল ইসলাম বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েই চিকিৎসাধীন থাকবেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শারীরিক পরীক্ষার জন্য কিছু নমুনা বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে। সেখান থেকে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সেই নমুনা সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে প্রতিবেদন আসে। আফতাব মাহমুদ চৌধুরীর দাবি, কারা কর্তৃপক্ষের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকায় ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে থাকা চিকিৎসকের বিএমডিসি নম্বর অনলাইনে যাচাইযোগ্য বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সব মিলিয়ে একদিকে কারা কর্তৃপক্ষ ও আইনজীবীদের ব্যাখ্যা, অন্যদিকে প্রসিকিউশনের সন্দেহ—এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনে বন্দিদের চিকিৎসা প্রতিবেদন এখন ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য কামরুল ইসলামকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আদেশ এবং পরে সেটি প্রত্যাহারের বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, উপযুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় আসামিপক্ষ এভারকেয়ারে নেওয়ার আবেদন করেছিল। গত ২৬ এপ্রিল হাসপাতালটিতে স্থানান্তরের আদেশের কপি তারা পান। তবে প্রসিকিউশন ওই আদেশের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে ৩০ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল সেটি প্রত্যাহার করে নেয়।
এদিকে প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একের পর এক আসামির অসুস্থতার আবেদন এখন একটি নিয়মিত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘ট্রেন্ড’। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো আসামির পক্ষ থেকে অসুস্থতার আবেদন ট্রাইব্যুনালে আসছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জামিন পাওয়ার কৌশল হিসেবে এসব অসুস্থতার দাবি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের সময় বিলম্ব ঘটানোর উদ্দেশ্যও থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। তাদের দাবি অনুযায়ী, একাধিক মামলায় আসামির অনুপস্থিতির কারণে আদেশের তারিখ তিনবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। তারা আরও অভিযোগ করে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রসিকিউশনকে অবহিত না করেই বন্দিদের প্রিজন হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে, যদিও তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আদালতের অনুমতি ছাড়া হওয়া উচিত নয়।
প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বলেন, লক্ষ্মীপুরের একটি মামলায় অসুস্থতার কাগজ দেখিয়ে হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী জামিন পান। তবে পরে জানা যায়, তিনি নিজের বিরুদ্ধে থাকা অন্য মামলার তথ্য গোপন করেছিলেন। তার জমা দেওয়া মেডিকেল রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, কারণ সেটি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত ছিল না। তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল-২ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধানকে তার শারীরিক পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
ফারুক আহাম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিভার সিরোসিসের মতো রোগের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিশ্চিত করাই ছিল উদ্দেশ্য। তবে দীর্ঘ সময় পর দাখিল করা প্রতিবেদনে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, আসামিপক্ষ আগেই জানত যে ওই প্রতিবেদনটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
সত্যিকার অর্থে অসুস্থ বা প্রকৃত কোনো কাগজপত্র আমরা এখন পর্যন্ত কারও পক্ষ থেকেই পাইনি। আমরা অত্যন্ত সচেতনার সঙ্গে কাজ করছি। কারণ, আসামিপক্ষ থেকে সত্য-মিথ্যাসহ নানা আবেদন আসতে পারে। কিন্তু আমরা যাচাই-বাছাই শেষে ট্রাইব্যুনালে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করি। আসলে এ ধরনের মিথ্যা কাগজপত্র দেখানোর মাধ্যমে বিচার বিলম্বিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন তারা। তবে, আমরা কোনোভাবেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে দেব না।—চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম
|
চিফ প্রসিকিউশন দপ্তর জানিয়েছে, এখন থেকে কোনো আসামির পক্ষ থেকে চিকিৎসাজনিত আবেদন এলে তা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। এ বিষয়ে বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
একজন আইনজীবী বলেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো আবেদন সরাসরি গ্রহণ বা শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে না। আগে চিফ প্রসিকিউটরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে এবং তাঁর অনুমোদন বা মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী শুনানি হবে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, প্রকৃতপক্ষে কেউ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে সরকার বাধ্য এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
এদিকে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের একটি অংশ নিয়মিতভাবেই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাসপাতালে ভর্তি বা জামিনের আবেদন করছেন। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের কথা উল্লেখ করে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে দাবি করেন এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার আবেদন করেন।
তিনি জানান, এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল আদেশ দিলেও পরবর্তীতে দেখা যায় এভারকেয়ার হাসপাতালে কোনো প্রিজন সেল নেই, ফলে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় আসে। পাশাপাশি দাখিল করা রোগের বিবরণ ও কাগজপত্রে অসংগতি এবং সন্দেহজনক তথ্য পাওয়ায় প্রসিকিউশনের আপত্তির পর আদালত ওই আদেশ বাতিল করেন।
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীর স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে লিভার সিরোসিসসহ যেসব রোগের কথা বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে সেগুলো সঠিক বলে মনে হয়নি। একইভাবে আবদুল জলিল মণ্ডল ও ফজলে করিম চৌধুরীর ক্ষেত্রেও অসুস্থতার দাবির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরার সময় আসামিদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক দেখা গেলেও আদালতে হাজির করার পর গুরুতর অসুস্থতার দাবি তোলা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও হাজতখানার আচরণও সেই দাবির সঙ্গে মিলছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চিফ প্রসিকিউটরের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত উপস্থাপিত কোনো স্বাস্থ্য প্রতিবেদনই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হিসেবে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সব আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পরই ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার মতে, এসব অসংগতিপূর্ণ নথির মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না।
একদিকে কারাগারে স্বাভাবিক চলাফেরা, অন্যদিকে আদালতে গুরুতর অসুস্থতার দাবি—এই দ্বৈত চিত্র ঘিরে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। চিকিৎসা নথির সত্যতা, জামিনের আবেদন এবং বিচার বিলম্বের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ। ফলে প্রশ্ন এখন শুধু অসুস্থতা নিয়েই নয়, বরং এসব আবেদন বিচার প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি বিচারকে ধীর করার কৌশল—সেই উত্তর খুঁজছে ট্রাইব্যুনাল। সূত্র: ঢাকা পোস্ট
সিভি/এম