ভারতীয় উপমহাদেশে টু ফিংগার টেস্ট বা ভার্জিনিটি টেস্ট নামে একটি মেডিকেল পরীক্ষা বিদ্যমান রয়েছে যা রেইপ ভিক্টিমদের উপর পরীক্ষা হিসেবে করা হয়। এই পরীক্ষাকে ঘিরে গত দুই দশকে চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানবাধিকার সংগঠন এবং সর্বোচ্চ আদালতগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা হয়েছে, এবং একে ধাপে ধাপে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক নারী অধিকার কর্মী এই প্রক্রিয়াকে নারীর অস্তিত্ব আর সতীত্বের উপর এক অবমাননাকরমূলক পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে এই টু ফিংগার টেস্ট হাইকোর্ট কতৃক বেআইনি ঘোষনা করে রায় জারি হয় ২০১৮ সালে, তবে বাস্তবে আজও অনেক জায়গায় এই পরীক্ষা চলমান থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
টু ফিংগার টেস্ট কী?
টু ফিঙ্গার টেস্ট (যা “পার ভ্যাজাইনাম পরীক্ষা” বা “ভার্জিনিটি টেস্ট” নামেও পরিচিত) হলো একটি শারীরিক পরীক্ষা, যেখানে চিকিৎসক ভুক্তভোগীর যোনিতে দুটি আঙুল প্রবেশ করিয়ে যোনির পেশির “শিথিলতা” এবং হাইমেন (সতীচ্ছদ) অক্ষত আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগী “যৌনক্রিয়ায় অভ্যস্ত” কিনা তা নির্ণয় করা।
ভারতে আইনি গ্রহনযোগ্যতা
ভারতে টু ফিঙ্গার টেস্ট নিয়ে সবচেয়ে ব্যাপক আইনী আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে লিলু বনাম হরিয়ানা রাজ্য (২০১৩), 14 SCC 643 (Criminal Appeal No. 1226 of 2011) কেসে , মেডিকেল অফিসার মালতি ভার্মা বলেছেন “ (International Covenant on Economic, Social and Cultural Rights, 1966) এবং (United Nations Declaration of Basic Principles of Justice for Victims of Crime and Abuse of Power, 1985) অনুযায়ী, ধর্ষণের বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা এমন আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী, যা তাদের পুনরায় মানসিক আঘাতের (retraumatization) মুখে ঠেলে দেয় না এবং তাদের শারীরিক বা মানসিক অখণ্ডতা ও মর্যাদা লঙ্ঘন করে না। এছাড়াও, তারা এমন চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকারী, যা তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ও অবগত সম্মতির (informed consent) অধিকারকে পূর্ণভাবে সম্মান করে পরিচালিত হয়।
এছাড়া ২০১২ সালের নির্ভয়া ধর্ষণ মামলার পর গঠিত বিচারপতি ভার্মা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৩ সালে ফৌজদারি আইন সংশোধন করা হয়, যাতে ভুক্তভোগীর পূর্ব যৌন ইতিহাস বা “যৌনক্রিয়ায় অভ্যস্ততা” আদালতে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা হয় (Indian Evidence Act, 53a).
বাংলাদেশে আইনি গ্রহনযোগ্যতা
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ব্লাস্ট (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস এন্ড ট্রাস্ট) সহ ছয়টি মানবাধিকার সংগঠন ২০১৩ বাদী হয়ে সর্বপ্রথম হাই কোর্টে একটা রিট করে, যেখানে টু ফিঙ্গার টেস্টকে সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ এবং সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়। রিটের শুনানি শেষে ২০১৮ সালে আদালত বলে যে এই পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এটি ভুক্তভোগীর সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও নির্দেশনা দেওয়া হয় যে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বা তদন্ত কর্মকর্তারা ভুক্তভোগীর পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না। মেডিকেল রিপোর্টে “যৌন সম্পর্কে অভ্যস্ত” জাতীয় শব্দ অপমানজনক ও মানহানিকরশব্দ ব্যবহার করা যাবে না। সেই সাথে হাই কোর্ট ৮ টি দিক নির্দেশনা দেন এই বিষয়ে।

কেস রেফারেন্স
সাদাফ আজিজ বনাম ফেডারেশন অব পাকিস্তান (২০২১), Writ Petition No. 13537 of 2020
এই কেসের রায়ে লাহোর কোর্ট বলেন- টু-ফিঙ্গার টেস্ট নারী ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে; তাই এটি পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯ (জীবনের অধিকার) এবং অনুচ্ছেদ ১৪ (মানবিক মর্যাদার অধিকার) এর পরিপন্থী। এছাড়া আদালত আরও রায় দেন যে, টু-ফিঙ্গার টেস্ট নারী ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক, কারণ এই পরীক্ষা শুধুমাত্র তাদের লিঙ্গের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। ফলে এটি পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫ (নাগরিকদের সমতার অধিকার) এরও লঙ্ঘন।
ঝাড়খণ্ড রাজ্য বনাম শৈলেন্দ্র কুমার রায় (২০২২), Criminal Appeal No. 1904 of 2022
প্রায় এক দশক পরেও বাস্তবে পরীক্ষাটি চলতে থাকায় সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় এ বিষয়ে রায় দেয়। বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় ও হিমা কোহলির বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে যে এই পরীক্ষা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল এবং পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের প্রতিফলন, যা যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের মর্যাদার প্রতি অবমাননা।
কিন্ত হাই কোর্ট থেকে এই পরীক্ষাকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করলেও, এখনো অনেক অঞ্চলে এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন চিকিৎসক ও ফরেনসিক কর্মীদের মধ্যে নতুন নির্দেশিকা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার অভাব। এছাড়া পুরনো মেডিকো-লিগ্যাল প্রোটোকল ও ফরম এখনও অনেক হাসপাতালে ব্যবহৃত হওয়া। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তদারকি ও জবাবদিহিতার ঘাটতি ইত্যাদি।
বিকল্প পদ্ধতি
টু ফিঙ্গার টেস্ট বাতিল হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR)-এর যৌথভাবে প্রণীত নির্দেশিকা, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার মন্ত্রণালয়ের “ন্যাশনাল প্রোটোকল ফর সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট মেডিকেল ফরেনসিক এক্সামিনেশনস”, এবং ভারত-বাংলাদেশের নিজস্ব মেডিকো-লিগ্যাল নির্দেশিকাগুলো এখন একটি অভিন্ন কাঠামো অনুসরণের সুপারিশ করে।
শারীরিক আঘাতের চিহ্ন নথিভুক্তকরণ
আধুনিক প্রোটোকলে জোর দেওয়া হয় সামগ্রিক শারীরিক পরীক্ষার ওপর—কেবল যৌনাঙ্গ নয়, শরীরের সব অংশে আঘাত, ক্ষত, কালশিটে বা প্রতিরোধের চিহ্ন খুঁজে তা ছবি ও লিখিত বিবরণসহ নথিভুক্ত করা। WHO-UNFPA-UNHCR এর ২০১৯ সালের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ সম্ভব না হলেও বা ভুক্তভোগী তাতে রাজি না হলেও, আঘাত নথিভুক্ত ও চিকিৎসার জন্য সম্পূর্ণ শারীরিক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এই নথি পরবর্তীতে আদালতে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যা কোনো ব্যক্তিগত অনুমান বা চরিত্র-বিচারের ওপর নির্ভর করে না।
ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রোটোকল অনুযায়ী, পরীক্ষায় মেডিকো-ফরেনসিক ইতিহাস গ্রহণ, বিস্তারিত পরীক্ষা, আঘাতের চিকিৎসা সমন্বয়, সম্পূর্ণ পরীক্ষার নথিভুক্তকরণ এবং যৌন নির্যাতন প্রমাণ সংগ্রহ কিট (rape kit) এর মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন। অপরাধীর বিরুদ্ধে সফল বিচার প্রক্রিয়ার জন্য এই প্রমাণ সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি ভুক্তভোগী যদি তাৎক্ষণিকভাবে ফৌজদারি প্রক্রিয়ায় যেতে না চান, তবুও ভবিষ্যতের জন্য তার অপশন সংরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে। ডিএনএ নমুনা, দৈহিক তরলের নমুনা ইত্যাদি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য, যেখানে টু ফিঙ্গার টেস্টের ফলাফলের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ভুক্তভোগীর মানসিক অবস্থা বিবেচনায় সংবেদনশীল ও সম্মতিমূলক পরীক্ষা পদ্ধতি
WHO-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে ভুক্তভোগীকে নিশ্চিত করতে হবে যে তিনি নিয়ন্ত্রণে আছেন—তিনি প্রশ্ন করতে পারবেন, যেকোনো সময় পরীক্ষা বন্ধ করতে পারবেন এবং পরীক্ষার যেকোনো অংশ প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন। ভুক্তভোগীকে জোর করে সহিংসতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে বাধ্য করা যাবে না; চিকিৎসাগত প্রয়োজনে যতটুকু দরকার ততটুকু প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

