রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে এখন লাল সিগন্যাল মানা আর শুধু ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না। মোড়ে পুলিশ না থাকলেও অনেক চালকের প্রতিটি গতিবিধি ধরা পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্যামেরার চোখে। ফলে সিগন্যাল লাল থাকলেও আগের মতো অবাধে আইন ভাঙার সুযোগ আর থাকছে না।
ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের বাঁশি বা হাতের ইশারার অপেক্ষা ছাড়াই এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হচ্ছে সড়কের প্রতিটি নিয়ম ভঙ্গের ঘটনা। পরে এসব ফুটেজ যাচাই-বাছাই করে পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির মালিকের কাছে ডিজিটাল মামলা বা নোটিশ হিসেবে।
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার পাশাপাশি বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সিসিটিভি ক্যামেরা। একই সঙ্গে চালু করা হয়েছে ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থা।
ট্রাফিক সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সড়কে সরাসরি পুলিশি উপস্থিতির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা সফলভাবে চালাতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল এবং জনসচেতনতা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার থেকে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়। রোববার পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক আইন ভাঙার আড়াই হাজারের বেশি ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব ফুটেজ যাচাই করছে ট্রাফিক পুলিশের টেকনিক্যাল টিম। যাচাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী মামলা ও নোটিশ পাঠানো হবে সংশ্লিষ্টদের কাছে।
রাজধানীর অন্তত পঁচিশটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরা লাল সিগন্যাল অমান্য করা, স্টপ লাইন অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না ব্যবহার, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন ধরনের আইনভঙ্গ শনাক্ত করছে।
এআই ক্যামেরার আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন, পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, রামপুরা ট্রাফিক বক্স, মিরপুর রোডের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এলাকা, গাবতলী এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণি।
কারওয়ান বাজার মোড়ের বাস্তব পরিস্থিতি:
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা কারওয়ান বাজার মোড়ে গতকাল সোমবার (১১ মে) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার বাস্তব প্রভাব। যানবাহনের চাপ আগের মতোই থাকলেও সড়ক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ক্যামেরার উপস্থিতি চালকদের আচরণে পরিবর্তন আনছে বলে লক্ষ্য করা গেছে।
মোড়ের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে সিগন্যাল অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ এবং উল্টো পথে চলাচলের মতো ঘটনা নজরদারি করা হচ্ছে। ট্রাফিক সিগন্যাল পরিবর্তনের মুহূর্তে অনেক চালককে আগের তুলনায় বেশি সতর্কভাবে চলতে দেখা যায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যরা। তাদের মতে, আগে অনেক চালক ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে সিগন্যাল অমান্য করলেও এখন ক্যামেরার নজরদারি সেই প্রবণতায় প্রভাব ফেলছে।
নতুন এই ব্যবস্থার ফলে সড়কে সরাসরি ট্রাফিক পুলিশের হস্তক্ষেপ কমছে এবং আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল এবং হেলমেট না পরার মতো অপরাধ শনাক্ত করছে। এতে চালকদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে এবং নিয়ম মানার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, যা যানজট নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট ও ট্রাফিক পরিদর্শকরা জানান, এআই ক্যামেরা চালুর পর আইনভঙ্গ শনাক্ত করা আগের তুলনায় দ্রুত হচ্ছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি থামিয়ে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে হতো, যার ফলে সড়কে জটলা তৈরি হতো এবং যানজট বাড়ত। এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ হওয়ায় সেই চাপ কমেছে এবং প্রমাণভিত্তিক মামলা দেওয়া সহজ হয়েছে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পরিদর্শক মো. সবদুল জানান, আগে আইন ভাঙা গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সড়কে দীর্ঘ সময় জটলা তৈরি হতো। কাগজপত্র যাচাই ও মামলা প্রক্রিয়ায়ও সময় বেশি লাগত। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটেজ সংগ্রহ হওয়ায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ওই মোড়ের ট্রাফিক সার্জেন্ট সুজয়। তিনি বলেন, আগে কাগজের স্লিপে মামলা দিতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতো। অনেক সময় লেখার সমস্যা হতো, আবার সড়কে গাড়ি থামানোর কারণে যানজটও বাড়ত। এখন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় প্রমাণসহ মামলা দেওয়া অনেক সহজ হয়েছে।
সব মিলিয়ে কারওয়ান বাজার মোড়ে এআই ক্যামেরা চালুর প্রভাব এখনই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। চালকদের সতর্কতা বাড়া এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরার ইঙ্গিত মিলছে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে।
চালক ও যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া:
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে এআই-চালিত ক্যামেরা বসানোর পর এর প্রভাব এখন সরাসরি অনুভব করছেন চালক ও যাত্রীরা। অনেকেই বলছেন, আগে যেখানে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা দেখা যেত, এখন সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে।
যাত্রীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চালকরা এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে সিগন্যাল মানছেন। কোথায়, কখন আইনভঙ্গের দৃশ্য রেকর্ড হচ্ছে তা নির্দিষ্টভাবে বোঝা না যাওয়ায় বাধ্য হয়েই অনেক চালক নিয়ম মেনে চলছেন বলে মনে করছেন তারা। এতে ধীরে ধীরে সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরছে বলেও মত তাদের।
কারওয়ান বাজার মোড়ে প্রাইভেটকার চালক আবদুল করিম বলেন, আগে অনেক চালক ট্রাফিক পুলিশ না দেখলে সিগন্যাল অমান্য করতেন। এখন ক্যামেরা বসানোর পর সবাই বেশি সতর্ক। কারণ কখন কোথায় ফুটেজ ধারণ হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। এতে নিয়ম মানার প্রবণতা বেড়েছে।
বাংলামোটর মোড়ে অপেক্ষমাণ বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমা আক্তার বলেন, আগে অনেক সময় সিগন্যাল ভেঙে গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তা পার হতে ভয় লাগত। এখন চালকরা তুলনামূলকভাবে ধীরে ও সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ালে সড়কে শৃঙ্খলা আরও স্থায়ীভাবে ফিরতে পারে।
এদিকে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. সবদুল জানান, আগে আইনভঙ্গের ঘটনায় গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সড়কে জটলা তৈরি হতো এবং মামলা প্রক্রিয়ায় সময় লাগত। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটেজ সংগ্রহ হওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন ও প্রযুক্তি:
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগে সড়কে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কাগজের স্লিপে মামলা দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পয়েন্ট অব সেল মেশিন চালু করা হয়। তবে সড়কে গাড়ি থামিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মামলা ও জরিমানা আদায় করতে গিয়ে অনেক সময় যানজট আরও বেড়ে যেত। এই সমস্যা কমাতেই ধাপে ধাপে এআই-নির্ভর ক্যামেরা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয় পুলিশ।
সূত্র আরও জানায়, রাজধানীতে স্থাপিত এসব ক্যামেরায় ব্যবহার করা হচ্ছে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী তৈরি একটি বিশেষ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই তথ্য যাচাই করে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইল ফোনে বার্তা এবং ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হবে।
তবে নতুন এই ব্যবস্থার সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। অনেক যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট, আবার কিছু যানবাহনে নম্বরপ্লেটই নেই। ফলে এসব যানবাহন শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছে ক্যামেরা। এই কারণে শিগগিরই গণবিজ্ঞপ্তি জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তির প্রতিক্রিয়া বুঝতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, “আমরা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। মামলা ও নোটিশ পৌঁছানোর পর মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝা যাবে। সব মিলিয়ে মূল্যায়ন করতে সময় প্রয়োজন। সার্ভারের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ চলছে, তাই আমরা ধীরে এগোচ্ছি। কাজ শেষ হলে বিস্তারিত পরিসংখ্যান জানানো হবে।”
তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি ফুটেজ সংগ্রহ হয়েছে। এসব ফুটেজ যাচাই করছে ট্রাফিক পুলিশের টেকনিক্যাল ইউনিট। বর্তমানে এই ইউনিটে সাতজন সদস্য কাজ করছেন। প্রয়োজনে জনবল আরও বাড়ানো হবে। যাচাই শেষে আগামী সাত দিনের মধ্যে মোবাইল ফোনে বার্তা এবং ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো শুরু হবে।
সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট থাকায় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে, যাতে ঢাকায় কোনো যানবাহন নম্বরপ্লেট ছাড়া চলাচল না করে এবং সব নম্বরপ্লেট স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান থাকে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট
সিভি/এম