পরিবার ভাঙনের ঘটনা বাড়ছে রাজধানীতে। দাম্পত্য কলহ, ভরণপোষণ, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতগুলোতে দিন দিন বাড়ছে মামলার সংখ্যা। বিশ্ব পরিবার দিবসে প্রকাশিত তথ্য বলছে, বর্তমানে রাজধানীর ১৪টি পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকার পারিবারিক আদালতগুলোতে মোট ১১ হাজার ৯৩৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বড় অংশই বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও দাম্পত্য বিরোধকে ঘিরে। পারভীন আক্তার ও শাকিল খান (উভয় নাম পরিবর্তিত) দম্পতির গল্প যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। ভালোবেসে সংসার শুরু করেছিলেন তারা। দীর্ঘ ২৫ বছরের দাম্পত্যে দুই সন্তানের জন্ম হলেও শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক গড়ায় আদালত পর্যন্ত।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালে এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়। শুরুতে সংসার স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে স্বামীর বিরুদ্ধে। নিজের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি ও নগদ অর্থ দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন পারভীন। একপর্যায়ে বিচ্ছেদের মাধ্যমে সম্পর্কের অবসান ঘটে। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পাশাপাশি ভরণপোষণ ও সন্তানের খরচ চেয়ে ২০২২ সালে পারিবারিক আদালত-৬ এ আরেকটি মামলা করা হয়। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
একই ধরনের বিরোধে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে আরও অসংখ্য পরিবার। আদালত সূত্র জানায়, পারিবারিক আদালত-৬ এ সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৮৭০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া আদালত-২ এ এক হাজার ৭৮৩টি এবং আদালত-৮ এ এক হাজার ১০৪টি মামলা রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বর্তমানে পাঁচটি আপিল আদালতও কাজ করছে।
গত বছর পর্যন্ত রাজধানীতে মাত্র তিনটি পারিবারিক আদালত ছিল। মামলার জট কমাতে পরে আদালতের সংখ্যা বাড়ানো হয়। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিচার শুরু হওয়ার আগে পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। আপস সম্ভব না হলে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
দাম্পত্য ভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। মিরপুরের বাসিন্দা রোজিনা বানু ও সেলিম পারভেজের ঘটনাও তেমনই একটি উদাহরণ। ২০০৮ সালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। পরে স্বামীর বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন রোজিনা। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালে তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়।
বিচ্ছেদের পর শুরু হয় দুই সন্তানকে ঘিরে আইনি লড়াই। মা ও বাবা—উভয়েই সন্তানদের হেফাজত চান। আদালতে হাজির করা হলে শিশুরা জানায়, তারা বাবা-মা দুজনকেই চায়। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপ বহন করতে হয় শিশুদেরই।
‘আমরাই পারি’ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক বলেন, পরিবার ভেঙে গেলেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তার মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে শিশুরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নারী অধিকারকর্মী খুশি কবির বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন দাম্পত্য ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত দেশগুলোতে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে সেই সুযোগ সীমিত। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিবেশ শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বিচ্ছেদের আগে শিশুদের ভবিষ্যতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফারহানা জামান মনে করেন, আধুনিক সমাজ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। মানুষের মধ্যে আপসের মানসিকতা কমছে এবং পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্বও আগের তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে।
তার ভাষায়, নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। আগে বিচ্ছেদকে সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হলেও এখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলেছে। তবে সুস্থ পারিবারিক জীবন টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, বর্তমানে মানুষ একে অপরকে সম্মান করার প্রবণতা হারাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সময় কাটানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
হিউম্যান রাইটস মনিটরিং অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার বলেন, আধুনিক জীবনযাত্রা পরিবারে মানসিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থ উপার্জনের ব্যস্ততায় স্বামী-স্ত্রী কেউই একে অপরকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার এবং সামাজিক মূল্যবোধ চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, মামলার জট কমাতে আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিচারক সংকট, ছুটি এবং বারবার সময় নেওয়ার কারণে অনেক মামলা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছা থাকলে আগামী দিনে পারিবারিক আদালতের মামলার চাপ কমে আসবে।

