আদালতের দীর্ঘ ছুটি শুধু বিচারপ্রক্রিয়াকেই ধীর করে দিচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে হাজারো আইনজীবীদের জীবিকা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার ওপরও? দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে এমন প্রশ্ন উঠছে সুপ্রিম কোর্টের কর্মদিবস ও দীর্ঘ ছুটি ঘিরে।
একদিকে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলার চাপ, অন্যদিকে আদালত বন্ধ থাকায় আয়হীন হয়ে পড়া আইনজীবীদের দুর্ভোগ। বিশেষ করে যারা প্রতিদিনের শুনানির ওপর নির্ভর করে সংসার চালান, আদালতের দীর্ঘ ছুটি তাদের জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেই থেমে যায় বহু মানুষের ন্যায়বিচারের অপেক্ষা। দীর্ঘ ছুটি কিংবা টানা বন্ধের কারণে মামলার শুনানি পিছিয়ে যায়, ফলে বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হতে থাকে। এতে শুধু মামলাজট বাড়ে না, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, আদালত বন্ধ থাকার প্রতিটি দিনই বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে তোলে। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি পিছিয়ে যায়, আর নতুন মামলার চাপ যোগ হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জরুরি শুনানি না হওয়ায় অনেক মানুষ দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

আইনজীবীদের ভাষ্য, আদালত যত বেশি সময় বন্ধ থাকে, ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও তত দীর্ঘ হয়ে পড়ে। এতে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। আইনজীবীদের দাবি, বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে কর্মদিবস বাড়ানো এবং দীর্ঘ ছুটি কমানো জরুরি। পাশাপাশি ছুটিকালীন সময়েও পর্যাপ্ত ভ্যাকেশন বেঞ্চ চালু রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইনজীবীরা।
সুপ্রিম কোর্টের ছুটির হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে আদালতের বার্ষিক ছুটি ছিল ৫১ দিন। সে সময় কর্মদিবস ছিল ১৯৮ দিন। অন্যদিকে ২০২৬ সালে বার্ষিক ছুটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দিনে। এতে কর্মদিবস কমে হয়েছে ১৮২ দিন। অর্থাৎ ২০২৬ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট ১৬ দিন বেশি খোলা ছিল।
আঞ্চলিক তুলনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়ে রয়েছে বলে দাবি করেছেন আইনজীবীরা। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে কর্মদিবস ১৮২ দিন। সেখানে ভারতের বোম্বে হাইকোর্ট বছরে ২২৬ দিন, দিল্লি হাইকোর্ট ২৩৬ দিন , এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২৩৯ দিন, সিঙ্গাপুরের হাইকোর্ট বিভাগ বছরের প্রায় ২৫০-২৬০ দিন, কানাডার ফেডারেল কোর্ট বা অন্যান্য সুপিরিয়র কোর্টগুলোতে বছরে সাধারণত ২৬১ দিন এবং অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্টে বছরে প্রায় ২৫০ দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেছেন। তাদের দাবি, প্রথমত, বার্ষিক কর্মদিবস কমপক্ষে ২১০ দিনে উন্নীত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একই সঙ্গে সাধারণ ও দীর্ঘ ছুটির পরিমাণ কমাতে হবে। এছাড়া তৃতীয়ত, ছুটিকালীন সময়েও জরুরি বিষয় শুনানির জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকেশন বেঞ্চ চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই যদি আদালতের মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে দীর্ঘ ছুটি ও সীমিত কর্মদিবসের এই বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে? কারণ আদালতের প্রতিটি বন্ধ দরজার পেছনে অপেক্ষা করেন অসংখ্য মানুষ। কেউ ন্যায়বিচারের আশায়, কেউ জীবিকার তাগিদে। তাই সময়ের দাবি, বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে ছুটি ও কর্মদিবসের ভারসাম্য নতুন করে ভাবা হোক।

