দেশের সব নাগরিকের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—এমন প্রশ্ন তুলে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট বিভাগ। জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি আব্দুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালত রুলে জানতে চেয়েছেন, দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত ও আর্থিকভাবে সহনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না কেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এক মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ। আদালত স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। রিট আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ১৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে চরম সংকটে পড়ছেন।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক আর্থিক দুর্ভোগ ছাড়াই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাবে। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হচ্ছে।
রিটে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়। ফলে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেন না শুধু অর্থের অভাবে।
আবেদনে স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত সংকটের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, জাতীয় বাজেট ও জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। আবার বরাদ্দের একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যবহারও হয় না। চিকিৎসক ও নার্স সংকটের বিষয় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশে গড়ে প্রতি দুই হাজার মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক এবং প্রতি পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একজন নার্স রয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
রিটকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ২০৩২ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে সংবিধানপ্রদত্ত জীবন ও স্বাস্থ্য অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত হচ্ছে না।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত স্বাধীন কমিটি গঠন করা হলে সেটি সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকি, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রুল দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

