গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো স্বাধীন বিচার বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থেকে বিচারকরা যখন সংবিধান ও আইনের আলোকে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, তখনই নাগরিকের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত হয় কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বাংলাদেশে যে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে আবারও সামনে এনেছে।
বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার দাবি নতুন নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আন্দোলনের ফল। সেই ধারাবাহিকতায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে বিএনপি সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেই সচিবালয় বিলুপ্ত করা এবং সেখানে কর্মরত ১৫ জন বিচারক ও কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে—যখন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে, তখন বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন কেন হলো? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের ভিত্তিতে একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি হয়েছিল। সেখানে বিচারক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল এবং কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল অর্থাৎ এটি কেবল পরিকল্পনার পর্যায়ে ছিল না, বাস্তব কাঠামো হিসেবেই কার্যকর হয়েছিল। এই অবস্থায় পুরো কাঠামো বিলুপ্ত করে নতুন করে আইন আনার ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে। এতে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আগের সরকারের সময় বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিরপেক্ষতা হারিয়েছিল এবং তাদের নেতা-কর্মীরা হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। দলটির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবেও সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে প্রথম দিকের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে যখন সেই সচিবালয় বিলুপ্ত করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সংস্কারের ধারাবাহিকতা, নাকি সংস্কার থেকে সরে আসা?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অধ্যাদেশটি সংসদে পাস হয়নি। তাই প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল জানিয়েছেন, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরোধী কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং ভবিষ্যতে আরও পর্যালোচনা করে বিতর্কমুক্ত আইন প্রণয়ন করা হবে।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল দ্বন্দ্ব। হাইকোর্ট ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষ এখনো সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। এমন অবস্থায় সচিবালয়ের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এ কারণে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বিরোধী আইনজীবীদের একটি অংশ আদালত অবমাননার শামিল বলেও মনে করছেন। তাদের মতে, একদিকে আদালতে কার্যক্রম চালুর আশ্বাস দেওয়া এবং অন্যদিকে বাস্তবে সচিবালয় বিলুপ্ত করা বিচার বিভাগের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতার দুর্বলতা। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, এক সরকার যে নীতি বা উদ্যোগ গ্রহণ করে, পরবর্তী সরকার সেটি বাতিল করে নতুনভাবে শুরু করে। এতে সময়, অর্থ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার অপচয় ঘটে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ।
বিচার বিভাগের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ন্যায়বিচারের বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে থাকা উচিত। সংবিধানে রাষ্ট্রক্ষমতার পৃথকীকরণের যে নীতি রয়েছে, তা বাস্তবায়নে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এখন প্রয়োজন কাঠামো ভেঙে ফেলা নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। যদি সত্যিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়ন করে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ—এমন ধারণাই আরও শক্তিশালী হবে।

