বিশ্বজুড়ে আদালতের কার্যক্রমে ধীরে ধীরে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার। আইনজীবী, বিচারক, আদালত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ বিচারপ্রার্থী—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছেন। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সময়ের চাপ, বাজেট সংকট এবং জনবল ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেকেই প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে দেখছেন।
তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে হানা পেইন নামের এক বিচারপ্রার্থীর নতুন শুনানির আবেদন প্রথমে একটি বিচারিক আদালত খারিজ করে দেয়। পরে জর্জিয়া সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। কারণ হিসেবে উঠে আসে, নিম্ন আদালতের আদেশে এমন কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে জানা যায়, ওই আদেশের খসড়া তৈরির দায়িত্বে থাকা আইনজীবী স্বীকার করেছেন যে তিনি খসড়া তৈরির সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছিলেন কিন্তু সেই তথ্য যাচাই না করেই তিনি কাজটি সম্পন্ন করেন।
এই ঘটনার পর জর্জিয়া সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে ছয় মাসের জন্য আদালতে মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের ওই আদেশ বাতিল করে নতুন করে আদেশ প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে নতুন আদেশের খসড়া কোনো পক্ষের আইনজীবী দিয়ে তৈরি করা যাবে না বলেও জানানো হয়। এছাড়া জর্জিয়া সুপ্রিম কোর্ট অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের সব বিচারিক আদালতকে নির্দেশনা দিয়েছে, যেন ভবিষ্যতে কোনো আদেশ বা নথিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হয়েছে কি না—সে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্য পর্যায়ের বিচারিক আদালতগুলোতে রায় ঘোষণার পর একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বিচারকরা মৌখিক রায়ের ভিত্তিতে বিজয়ী পক্ষের আইনজীবীকে একটি প্রস্তাবিত আদেশ বা খসড়া প্রস্তুত করতে বলেন। সীমিত জনবল ও বিপুল মামলার চাপ সামলাতে এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। আইনজীবীদের তৈরি করা সেই খসড়া পরে বিচারক যাচাই করে চূড়ান্ত আদেশ হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে আদালতভেদে এই প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে এই রীতি প্রচলিত নয়। সেখানে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বিচারক এবং আদালতের কেরানিরা নিজেরাই চূড়ান্ত রায় ও আদেশের খসড়া প্রস্তুত ও নথিভুক্ত করেন। এ ধরনের রীতির চর্চা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। কমন ল’ বা সাধারণ আইন ব্যবস্থা অনুসরণ করা দেশগুলোর মধ্যে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়ার মতো দেশেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বিচারকরা রায় প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের সহায়তা গ্রহণ করেন। তবে বিশ্বের অনেক সাধারণ আইনভিত্তিক দেশে আবার রায় লেখার দায়িত্ব পুরোপুরি বিচারক বা আদালতের স্টাফদের ওপরই ন্যস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও সাধারণত বিচারকরা নিজেরাই রায় লেখার দায়িত্ব পালন করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুরোধে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর সহায়তা নেওয়ার নজিরও রয়েছে।
“পেইন বনাম স্টেট” মামলাটি বিচার ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং খসড়া আদেশ প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মামলার বিচারিক আদালতের আদেশটি কাঠামোগতভাবে অস্বাভাবিক বা ত্রুটিপূর্ণ ছিল না। বরং প্রচলিত রীতি অনুযায়ীই এটি তৈরি হয়েছিল।
প্রচলিত প্রক্রিয়ায় আইনজীবীরা বিচার শেষে আদালতের মৌখিক রায় অনুযায়ী প্রস্তাবিত আদেশের খসড়া প্রস্তুত করেন। ব্যস্ত আদালত ব্যবস্থায়, বিশেষ করে রাজ্য পর্যায়ের আদালতগুলোতে, প্রতিদিন শত শত এ ধরনের খসড়া তৈরি ও অনুমোদনের কাজ চলে। বিচারক সাধারণত সেই খসড়া পর্যালোচনা করে স্বাক্ষর করেন।
এই মামলাতেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী আদেশের খসড়া তৈরি করেন এবং বিচারক সেটিতে স্বাক্ষর করেন। তবে ব্যতিক্রম ছিল একটি গুরুতর বিষয়—আদেশে এমন কিছু আইনি উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি প্রথম ঘটনা নয়।
গত বছর জর্জিয়াতেই “শহীদ বনাম ইসাম” নামের একটি বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সেখানে আইনজীবীর তৈরি খসড়া আদেশে বিচারক স্বাক্ষর করেন, যেখানে দুইটি ভুয়া বা অস্তিত্বহীন মামলার উদ্ধৃতি ছিল। পরে জর্জিয়া কোর্ট অব আপিলস সেই আদেশ বাতিল করে দেয়। এর কয়েক মাস পর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পারিবারিক হেফাজত সংক্রান্ত মামলাতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। সেখানে একটি বিচারিক আদালত কাল্পনিক পারিবারিক আইন সিদ্ধান্তের উদ্ধৃতি থাকা একটি প্রস্তাবিত আদেশে স্বাক্ষর করে ফেলে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আইনজীবী, স্বপ্রতিনিধিত্বকারী বিচারপ্রার্থী এবং কখনো কখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহারের কারণে ভুয়া বা অস্তিত্বহীন উদ্ধৃতি সংযুক্ত হওয়ার ঘটনা সামনে আসছে। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সমালোচকদের মতে, বিষয়টি শুধু আইনজীবীর দায়ে সীমাবদ্ধ নয়। বিচারকেরও দায়িত্ব থাকে খসড়া আদেশ সতর্কভাবে পর্যালোচনা করার।
কারণ, একজন আইনজীবী ভুয়া তথ্য দিয়ে নথি দাখিল করলে তা গুরুতর অনিয়ম তৈরি করে কিন্তু সেই একই তথ্য যখন বিচারক স্বাক্ষর করে আদালতের আদেশে পরিণত করেন, তখন সেটিই আইনি কর্তৃত্ব পেয়ে যায়।
নিয়মানুসারে বিচারকের উচিত খসড়া আদেশ পড়ে দেখা, প্রয়োজন হলে সংশোধন করা এবং নিশ্চিত হওয়া যে তা ঘোষিত রায়কে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে। তবে বাস্তবতায় কাজের চাপ ও সময়সীমার কারণে অনেক সময় এই প্রক্রিয়া কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে তৈরি করা খসড়া আদেশ বাহ্যিকভাবে পরিপাটি, আইনি উদ্ধৃতিযুক্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু সেই খসড়ার ভেতরে এমন আইন বা নজির থাকতে পারে, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই—যা বিচারিক ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্বজুড়ে বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আইনজীবী, বিচারক, আদালত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষও এখন বিভিন্ন পর্যায়ে এই প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছেন। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সময়ের চাপ, বাজেট সংকট, জনবল ঘাটতি এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে আদালত ব্যবস্থায় এআই অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার একই সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশেষ করে কমন ল বা সাধারণ আইনভিত্তিক দেশগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিচারব্যবস্থাগুলোতে অনেক সময় আইনজীবীরাই আদালতের রায়ের খসড়া প্রস্তুত করে দেন। বিচারক সেই খসড়া পর্যালোচনা করে স্বাক্ষর করেন। ফলে আইনজীবীর দাখিল করা নথি এবং উপস্থাপনাই অনেক ক্ষেত্রে রায়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থী যদি এআই ব্যবহার করে ভুয়া বা অস্তিত্বহীন উদ্ধৃতি যুক্ত করেন, তবে বিচারক সরাসরি তা শনাক্ত করতে না পারলেও তা আদালতের রায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। এমনকি বিচারক নিজে এআই ব্যবহার না করলেও, আদালতে দাখিল হওয়া নথির মাধ্যমে এআই-জনিত ভুল রায়ে প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
আদালতের ওপর থাকা কাজের চাপ, সীমিত সময়, অর্থ ও জনবল সংকট এবং দ্রুত রায় প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক চাপের কারণে সব নথি গভীরভাবে যাচাই করা সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে কোনো নথিতে এআই-নির্ভর ভুল বা ভুয়া উদ্ধৃতি আছে কি না, তা সবসময় ধরা পড়ে না। এছাড়া অনেক দেশে এখনো আদালতের কাজে এআই ব্যবহারের বিষয়ে বাধ্যতামূলক ঘোষণা, নিয়ন্ত্রণ বা পেশাগত দায়িত্ব নির্ধারণের স্পষ্ট বিধান গড়ে ওঠেনি। ফলে আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থী এআই ব্যবহার করলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতাও নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মানে এই নয় যে বিচারকদের প্রতিটি নথিকে অবিশ্বাস করতে হবে বা প্রতিটি মামলাকে অতিরিক্ত জটিল যাচাই প্রক্রিয়ায় নিতে হবে। তবে এখন আর এমন ধারণা রাখা সম্ভব নয় যে আদালতে দাখিল হওয়া প্রতিটি উদ্ধৃতি কেবলমাত্র মানবিক গবেষণা ও যাচাইয়ের ফল। তাদের মতে, এআই একদিকে বিচার ব্যবস্থার কাজের চাপ কমাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিটি তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের দায়িত্বকে আরও কঠিন করে তুলছে।
আইনি নথিতে বিচারকের স্বাক্ষর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নয়, বরং তা আইনগত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, যা মানুষের অধিকার, সম্পদ ও জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই রায় বা আদেশ আদালতের বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই বাস্তবতায় এআই-নির্ভর যুগে বিচারকদের আরও বেশি সতর্কতা, যাচাই এবং দায়িত্বশীলতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
- লেখক:রাইসুল সৌরভ: আয়ারল্যান্ডের গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের ব্যবহারবিষয়ক ডক্টরাল
গবেষক; সহযোগী অধ্যাপক (শিক্ষা ছুটিতে), আইন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)

