‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ থেকে শুরু। এরপর নাম বদলে হয় ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’। সর্বশেষ এসেছে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ কিন্তু নামের এই পরিবর্তনের পরও আইন ঘিরে বিতর্ক থামেনি। বরং সাংবাদিক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে বলছেন, বাস্তবে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাদের মতে, কিছু আলোচিত ধারা বাদ দেওয়া হলেও একই ধরনের বিধান নতুনভাবে যুক্ত থাকায় পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে।
সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরেই ২০১৮ সালের ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে ৫৭ নম্বর ধারা এবং ৮, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩২ নম্বর ধারাগুলো বাতিলের দাবি ওঠে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এসব ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
পরবর্তীতে সমালোচনা ও আলোচনার প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে আইনটি রহিত করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করা হয়। তখন ৫৭ নম্বর ধারার বিষয়টি বাদ দেওয়া হলেও নতুন আইনে অন্যভাবে কিছু বিধান যুক্ত হওয়ায় আবারও আপত্তি ওঠে। সাংবাদিকদের একটি অংশ তখনও ২৫, ২৯ ও ৪২ নম্বরসহ একাধিক ধারা বাতিলের দাবি জানায়। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নও আটটি ধারা বাতিল এবং চারটি ধারা সংশোধনের দাবি তোলে।
এরপর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ২০২৫ সালের ২১ মে জারি করা হয় ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’। যদিও নতুন নামে আইন পরিবর্তন করা হয়, তবুও সমালোচকদের মতে আগের বিতর্কিত অনেক বিষয়ই নতুন কাঠামোয় বহাল থাকে।
পরবর্তীতে আবার পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানে এটি ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ হিসেবে কার্যকর রয়েছে। তবে আইনটির কাঠামো ও বিধান নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত। সাংবাদিক ও আইনজীবীদের একটি অংশের মতে, ‘ধর্মানুভূতি’ শব্দটি বাদ দেওয়া হলেও ‘ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ’, অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং মত প্রকাশ সংক্রান্ত বিধানগুলো রয়ে গেছে। ফলে অনেকেই এটিকে পরিবর্তনের চেয়ে নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন।
সব মিলিয়ে ধারাবাহিক নাম পরিবর্তন হলেও মূল বিতর্ক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—আসল পরিবর্তন কতটা হলো, আর কতটা শুধু নামেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
পুরোনো বিতর্কিত ধারাগুলো বাদ যায়নি:
নতুন নাম, নতুন কাঠামো—তবু অভিযোগ একই। ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’-এ ২০২৩ সালের ‘সাইবার নিরাপত্তা আইনের’ বিতর্কিত অনেক ধারা প্রায় হুবহু প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ভাষাগত পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাস করা হলেও মূল বিষয়বস্তু অনেক ক্ষেত্রেই অপরিবর্তিত রয়েছে।
নতুন আইনে পুরোনো বিতর্কিত আটটি ধারা প্রায় একইভাবে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে একটি নতুন উপধারা যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—এই ধারা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারণ করা হবে।
আগের আইনের ২৫ ধারার অপরাধ সংক্রান্ত বিষয় নতুন আইনের ২৩ ধারায় স্থানান্তর করা হয়েছে। যেখানে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি বিষয় ছিল। নতুন আইনের ২৫ ধারায় আবার যুক্ত করা হয়েছে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড।
একই ধরনের অপরাধ কাঠামো আগের ২৫ ও ২৯ ধারার মধ্যেও ছিল। সেখানে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং ও অশ্লীল কনটেন্ট প্রকাশের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। দণ্ডবিধির মানহানি সংক্রান্ত ৪৯৯ ধারার আলোকে এসব বিচার্য হতো। নতুন আইনে এসব বিষয় আলাদা করে আরও কঠোরভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত সংক্রান্ত আগের ২৮ ধারা নতুন আইনে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, এর পরিবর্তে ‘ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ভাষা বদলালেও অপরাধের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
আইন-শৃঙ্খলা অবনতি সংক্রান্ত ৩১ ধারার বিষয়ও নতুন কাঠামোয় বহাল রয়েছে। আগের ধারায় বলা ছিল, এমন কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা হলে যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা, শত্রুতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দণ্ড ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। এই বিধান নতুন আইনে ২২ ও ২৬ ধারায় বিভক্ত করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, হ্যাকিং সংক্রান্ত ৩২ ধারাও নতুন আইনে বিস্তৃতভাবে স্থান পেয়েছে। আগে যেখানে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান ছিল, নতুন আইনে তা ২১, ২২ ও ২৩ ধারায় ভাগ করে বিভিন্ন অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। কোম্পানি কর্তৃক অপরাধ সংঘটনের বিষয়টি আগের আইনের ৩৫ ধারায় ছিল। সেটি নতুন আইনে ২৯ ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত ২৯ ধারাও নতুন কাঠামোয় ২৫ ও ২৬ ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে। আগে যেখানে ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে ধরা হতো এবং সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান ছিল, নতুন আইনে তা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
সবশেষে, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ, ঘৃণা ও সহিংসতা সংক্রান্ত অপরাধ নতুন আইনের ২৬ ধারায় বিস্তারিতভাবে রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে এমন তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা হলে যা সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উসকানি দেয়, তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

