অ্যাটর্নি জেনারেল (এজি) অফিসের ২০২৬ সালের গতকাল (২ জুন) জারি করা ৪৮৪৮(আই)এজি-২০২৬ নম্বর সার্কুলারকে ঘিরে আইনগত ও বাস্তবিক নানা প্রশ্ন উঠেছে। সার্কুলারটিতে এফিডেভিট সম্পন্ন হওয়ার ৭ দিনের মধ্যে নোটিশ ইস্যু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই নির্দেশ ঘিরে আদালতের প্রক্রিয়া, ক্ষমতার সীমা এবং বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নোটিশ জারি বা প্রদান মূলত আদালতের কার্যপ্রণালির অংশ। এটি বিচারিক তত্ত্বাবধানের আওতায় পড়ে। ফলে কোনো প্রশাসনিক দপ্তর, বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগের অংশ হিসেবে কাজ করা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, আদালতের কার্যপ্রক্রিয়ায় সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনি বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এজি অফিস রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে প্রতিনিধিত্ব করলেও আদালতের কার্যপ্রণালি নির্ধারণের এখতিয়ার তাদের নেই। যদি কোনো বাধ্যতামূলক সময়সীমা আরোপ করতেই হয়, তাহলে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট রুল সংশোধন করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র প্রশাসনিক সার্কুলার দিয়ে এমন পরিবর্তন আনা যায় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন এই ৭ দিনের শর্ত হাইকোর্ট বিভাগের বিদ্যমান রুলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত প্রকাশ করা হচ্ছে। বর্তমানে আবেদন দাখিলের পর মোশন উপস্থাপনের জন্য ৪৫ দিনের সুযোগ রয়েছে। বাস্তবে আইনজীবীরা বিভিন্ন কৌশলগত ও পেশাগত কারণে এই সময়ের মধ্যেই সুবিধাজনক সময়ে মোশন উপস্থাপন করেন কিন্তু ৭ দিনের মধ্যে নোটিশ ইস্যু বাধ্যতামূলক হলে তা অনেক ক্ষেত্রেই পুরো প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সার্কুলারে আরেকটি শর্তে বলা হয়েছে, আবেদন দাখিলকারী ও নোটিশ সত্যায়নকারী একই আইনজীবী হতে হবে। বাস্তব আইনি চর্চায় এটি সব সময় অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। সিনিয়র ও জুনিয়র আইনজীবী, চেম্বার ব্যবস্থাপনা, অসুস্থতা, সফর এবং পেশাগত ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় অন্য তালিকাভুক্ত আইনজীবী নোটিশ সত্যায়ন করেন। তাই এ ধরনের কঠোর নিয়ম বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
টেন্ডার নম্বর সংক্রান্ত জালিয়াতি ও কারসাজি বন্ধের উদ্দেশ্যে সার্কুলারটি আনা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই নিয়ম কি আসল সমস্যার সমাধান করছে? সংশ্লিষ্টদের মতে, টেন্ডার নম্বরের গরমিল সাধারণত ডেটা এন্ট্রি ও ইস্যু পর্যায়ে ঘটে। এফিডেভিট বা নোটিশ গ্রহণের সময়সীমার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
ফলে নতুন বিধিনিষেধ হয়তো প্রকৃত জালিয়াতি রোধে তেমন কার্যকর হবে না। বরং এতে সৎ আইনজীবীদের ওপর অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, অসাধু চক্র বিকল্প পথ খুঁজে নেবে।
সমাধান হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এজি অফিস একটি ডিজিটাল নোটিশ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে। এতে একটি ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টেন্ডার নম্বর দিয়ে নোটিশের অবস্থা জানা যাবে। কখন জমা হয়েছে, কোন আদালতে যাবে—এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
এছাড়া নিরাপত্তা সূচকযুক্ত স্টিকার, আইনজীবী লগইন ব্যবস্থা এবং সীমিত জনসাধারণের দেখার সুযোগ রাখলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে নোটিশে থাকা তথ্যের সঙ্গে সিস্টেমের তথ্য মিলিয়ে সহজেই অসংগতি ধরা যাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সার্কুলার স্বচ্ছতার লক্ষ্য থাকলেও এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বেড়েছে। আইনি ভিত্তি, বাস্তব প্রয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য—এই তিন দিকেই এটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭ দিনের বাধ্যতামূলক শর্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনজীবী সংক্রান্ত শর্তেও যুক্তিসংগত ব্যতিক্রম রাখা উচিত। দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হিসেবে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও নিরীক্ষাযোগ্য নোটিশ ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

