সন্তানের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসহায় জীবন এবং বহু ক্ষেত্রে করুণ মৃত্যুর ঘটনাগুলো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এমনই এক সাম্প্রতিক মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’।
আইনে কী বলা আছে:
এই আইনের মূল ভিত্তি হলো পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করা। এখানে ভরণ-পোষণ বলতে শুধু খাবার বা পোশাক দেওয়াকে বোঝানো হয়নি। এর পরিধি অনেক বিস্তৃত।
আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য ও উপযুক্ত বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। অসুস্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবা-যত্ন নিশ্চিত করাও সন্তানের আইনি দায়িত্ব।
আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সন্তানকে যথাসম্ভব পিতা-মাতার সঙ্গে একসঙ্গে বসবাসের চেষ্টা করতে হবে। তবে আলাদা বসবাস করলে নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হবে এবং নিজের আয়ের একটি যৌক্তিক অংশ তাদের জন্য প্রদান করতে হবে।
পিতা ও মাতা উভয়েই জীবিত থাকলে ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পিতা-মাতা অনুপস্থিত থাকলে বা অক্ষম হলে সেই দায়িত্ব সন্তানের ওপরই বর্তায় দাদা-দাদী এবং নানা-নানীর ক্ষেত্রেও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো সন্তান তার পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও জোরপূর্বক পাঠাতে পারবে না।
আইনের বিধান অমান্য করে পিতা-মাতাকে অবহেলা করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা করা যেতে পারে। জরিমানা অনাদায়ে বা অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া শুধু সন্তানই নয়, সন্তানের স্বামী বা স্ত্রী যদি পিতা-মাতার ভরণ-পোষণে বাধা সৃষ্টি করে বা অবহেলার জন্য প্ররোচিত করে, তবে তিনিও সহায়তাকারী হিসেবে একই শাস্তির আওতায় পড়বেন।
কোনো পিতা-মাতা যদি এই আইনের আওতায় প্রতিকার চান, তবে প্রথম শ্রেণির বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট বা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে হয়।
তবে আদালত শুরুতেই কঠোর শাস্তির পথে না গিয়ে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরের মাধ্যমে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
যদি এসব সামাজিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তখনই আদালত মূল মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শাস্তির বিধান কার্যকর করে।

