১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকটে যে দেশটি সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেখানে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের কাঠামো এখনও কার্যকরভাবে কাজ করছে না। ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইন থাকলেও বাস্তবে এই বিচারব্যবস্থা অনেকটাই অকার্যকর রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ দুটি—
প্রথমত, নাগরিকরা সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন না। এর জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সারাদেশে মাত্র দুটি পরিবেশ আদালত থাকায় সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই জটিলতার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে অধিকারকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন এবং ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদের অভিজ্ঞতায়। বারবার চেষ্টা করেও তারা পরিবেশ বিষয়ক মামলা এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আইনের ৬ নম্বর ধারায় বলা আছে, কেবল পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তার অনুমোদিত কর্মকর্তারাই সরাসরি মামলা করতে পারেন। পাশাপাশি বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও পরিবেশ আদালত কোনো অপরাধ বা ক্ষতিপূরণের মামলা গ্রহণ করতে পারে না, যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের লিখিত প্রতিবেদন না থাকে।
ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, বিশেষায়িত পরিবেশ আদালত থাকলেও এর উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। কারণ আদালতের সংখ্যা কম এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি মামলা করতে পারে না।
আইন ও নীতি বিষয়ক সংগঠন সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিনও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির শর্তের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তর কি সহজে মামলা করার অনুমতি দেবে? এমন বিধান আসলে জটিলতা তৈরি করেছে এবং পরিবেশ ন্যায়বিচারকে প্রহসনে পরিণত করেছে।”
শোভন জানান, জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তিনি মামলা এগিয়ে নেননি। নিশাত মাহমুদ বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে একাধিকবার মামলা করতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
পরিবেশবিদরা এখন আইন সংশোধনের দাবি জানাচ্ছেন। তাহিন বলেন, প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যদিকে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, নাগরিক ও সংগঠনকে সরাসরি মামলা করার সুযোগ দিতে হবে এবং তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকা উচিত।
আইনের ৪(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় একটি করে পরিবেশ আদালত থাকার কথা থাকলেও ২০১০ সালের পর নতুন কোনো আদালত গঠন হয়নি। বর্তমানে ঢাকায় ও চট্টগ্রামে থাকা মাত্র দুটি পরিবেশ আদালতই কার্যকর রয়েছে। এগুলো মূলত ২০০২ সালে স্থাপিত হয়ে পরে ২০১০ সালের আইনে পুনর্গঠিত হয়। ঢাকায় একটি পরিবেশ আপিল আদালতও রয়েছে। ফলে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায় কোনো পরিবেশ আদালত নেই।
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পরিবেশ ন্যায়বিচারকে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। পাশাপাশি নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনকে সরাসরি জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ দিতে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ বছরে পরিবেশ আদালতে মাত্র প্রায় ৭০০টি মামলা হয়েছে। বছরে গড়ে ২৯টিরও কম মামলা পড়ে। ২০২৬ সালের ৪ জুন পর্যন্ত ৪৭২টি মামলা বিচারাধীন এবং ২০৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন শাখার সহকারী পরিচালক খন্দকার মোহাম্মদ তাহাজুত আলী জানান, এসব মামলায় ৪৬০টিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো. লুতফর রহমান বলেন, বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোট ১ হাজার ৫১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯০টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ১ হাজার ১২৬টি এখনো বিচারাধীন। তুলনায় হাইকোর্টে পরিবেশ বিষয়ক রিট আবেদন অনেক বেশি। গত ২৪ বছরে মোট ২ হাজার ৩৯০টি রিট দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০টি নিষ্পত্তি এবং ১ হাজার ২৪৯টি এখনো বিচারাধীন। গড়ে প্রতি সপ্তাহে দুইটি করে রিট দায়ের হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় রিটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সাধারণত অন্য কোনো কার্যকর প্রতিকার না থাকলেই রিট করা হয়। পরিবেশ আদালত আইন ও বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মামলা শুরুর ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে।
তবে মামলা কম থাকায় পরিবেশ আদালতে অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক মামলা, এমনকি চেক প্রতারণার মামলাও উঠছে। একইভাবে বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও সাধারণ মামলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারিক দক্ষতার ঘাটতি, সীমিত এখতিয়ার, স্বপ্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণের ক্ষমতার অভাব, রায় বাস্তবায়নে দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের সীমিত প্রবেশাধিকার—এই সবই বড় দুর্বলতা।
যদিও বাংলাদেশ বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের একটি যেখানে পরিবেশ আদালত রয়েছে, ২০১০ সালের আইন আসার পরও কাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। উচ্চ আদালতের মতো পরিবেশ আদালতের স্বপ্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণের ক্ষমতা নেই। তাই অবৈধ ইটভাটা, নদী দখল বা বন উজাড়ের মতো ঘটনায় এখনো মূল ভরসা হয়ে আছে রিট আবেদন।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিট ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং মূলত সাংবিধানিক ব্যাখ্যার জন্য তৈরি। পরিবেশগত ক্ষতি বা ক্ষতিপূরণের জন্য এটি কার্যকর পথ নয়।
অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, “পরিবেশ ন্যায়বিচার সহজলভ্য হতে হবে। প্রতিটি জেলায় আদালত থাকতে হবে এবং নাগরিক ও সংগঠনকে সরাসরি মামলা করার সুযোগ দিতে হবে।”
বাংলাদেশে পরিবেশ আদালত থাকা সত্ত্বেও আইনি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে তা মূলত একটি ‘কাগুজে প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশের জন্য এমন দুর্বল বিচারব্যবস্থা কেবল পরিবেশগত ক্ষতিই বাড়াবে না, বরং সাধারণ মানুষের আইনি সুরক্ষার অধিকারকেও ক্ষুণ্ণ করবে।

