দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। গত এক থেকে দেড় দশকে মামলার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এখন বিচারব্যবস্থায় ‘জট’, ‘চাপ’ ও ‘মহাজট’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে পরিস্থিতি এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগও বহুগুণ বেড়েছে।
২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার সময় দেশে জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটির কিছু বেশি। তখন উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। প্রায় ১৯ বছর পর জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটিতে। একই সময়ে বিচারাধীন মামলা বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত মার্চ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ৩৮ হাজার ৯৭৩টি। হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি। আর অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি।
গত ছয় বছরে প্রতিদিন গড়ে আদালতে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৪৪৩টি মামলা। ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মোট ৭৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। বছরে গড়ে এসেছে ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০টি মামলা। মাসের হিসেবে তা প্রায় ১ লাখের বেশি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০২০ সালে বিচারাধীন ও প্রাপ্তসহ মোট মামলা ছিল ৫০ লাখ ৭২ হাজার ৩৪১টি। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৫৭ লাখ ২৮ হাজার ১১৪টি। ২০২২ সালে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৭০৬টি। ২০২৩ সালে ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৫৭১টি। ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৭টিতে।
এই সময়ে নিষ্পত্তির হার তুলনামূলক কম। ছয় বছরে বছরে গড়ে প্রায় ১০ লাখ ৭ হাজার ৮৮৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমি নিয়ে বিরোধ, বিকল্প সমাধানের প্রতি অনাগ্রহ, আইন অমান্য করার প্রবণতা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট মামলার সংখ্যা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বিচারক সংকট, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং শুনানি বিলম্বও বড় কারণ।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, মামলার চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুরো ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুধু সভা বা নির্দেশনা নয় একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত আইন অনুযায়ী না হওয়ায় মামলার সংখ্যা বাড়ছে। আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে এই চাপ কমবে না।
আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিই সবচেয়ে বড় সমাধান হতে পারে। তিনি মত দেন, একটি মামলার সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলে জট অনেকটাই কমে আসত।
অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু বলেন, অধস্তন আদালতে অন্তত ১০ হাজার বিচারক প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার বিচারক কর্মরত আছেন। তিনি অবকাঠামোগত ঘাটতিকে বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মামলার এই অতিরিক্ত চাপের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় হলেও সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির উদ্দেশ্যেও মামলা করা হয়।

