কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবার আইনি ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ইংল্যান্ডের একটি আদালতে প্রথমবারের মতো এমন একটি মামলায় জয় এসেছে, যেখানে মামলার প্রাথমিক ও জটিল আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এআইভিত্তিক একটি ল’ ফার্ম। ঘটনাটি সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আইনি সেবা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা তৈরি করার পাশাপাশি আইন পেশার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামিরেস কামাল তাকিদির নামের এক ফ্রিল্যান্স মানবসম্পদ পরামর্শক তার ৭ হাজার পাউন্ড বকেয়া পারিশ্রমিক আদায়ের জন্য ‘গারফিল্ড এআই’ নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হন। সেবার জন্য তিনি প্রায় ৪০০ পাউন্ড ফি প্রদান করেন।
এরপর প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে আইনি নোটিশ পাঠায় এবং পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতে নিয়ে যায়। মামলার পুরো প্রাক-শুনানি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত, আইনি জবাব তৈরি এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত কাজ সম্পন্ন করে এআইভিত্তিক ব্যবস্থা। তবে আদালতে সরাসরি শুনানির সময় মক্কেলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য একজন মানব ব্যারিস্টার নিয়োগ দেওয়া হয়।
গারফিল্ড এআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ ইয়ং এ ঘটনাকে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ের খরচ পাওনা অর্থের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। ফলে ছোট ব্যবসা বা ব্যক্তি পর্যায়ের অনেকেই তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের চেষ্টা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। গত বছরের এপ্রিল মাসে ‘সলিসিটরস রেগুলেশন অথরিটি’র অনুমোদন পাওয়া গারফিল্ড এআই বর্তমানে ৩০ পাউন্ড থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পাওনা আদায়ের দাবি সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা করে।
এই মামলায় এআই শুধু প্রাথমিক কাগজপত্রই প্রস্তুত করেনি, বরং বিবাদীপক্ষের উত্থাপিত পাল্টা দাবিরও আইনি জবাব তৈরি করেছে। অর্থাৎ বিচার শুরুর আগের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আইনি দায়িত্বই প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে।
গত ১৪ মে ওয়ান্ডসওয়ার্থ কাউন্টি কোর্টে অনুষ্ঠিত প্রায় তিন ঘণ্টার শুনানির জন্য এআই চারজন সাক্ষীর জবানবন্দি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ সংকলন প্রস্তুত করে। শুনানি শেষে আদালত তাকিদিরের পক্ষে রায় দেন এবং তার বকেয়া অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন।
রায়ের পর তাকিদির জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছিলেন না। তবে অর্থ উদ্ধারের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া তার কাছে ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং মানসিক চাপের কারণ বলে মনে হয়েছিল। গারফিল্ড এআইয়ের সহায়তা পাওয়ায় তিনি মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার সাহস পান।
তিনি আরও বলেন, বিবাদীপক্ষের পাল্টা দাবি তাকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল বলে তার বিশ্বাস। কিন্তু সহজলভ্য, কার্যকর এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী আইনি সহায়তা পাশে থাকায় তিনি আত্মবিশ্বাস হারাননি।
আদালতে তাকিদিরের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনকারী ব্যারিস্টার ডমিনিক লি বলেন, গারফিল্ড এআই মামলার বিষয়বস্তু অত্যন্ত সুসংগঠিত ও স্পষ্টভাবে প্রস্তুত করেছিল। তবে আদালতে সওয়াল-জবাব ও তাৎক্ষণিক আইনি যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা এখনও অপরিহার্য।
অন্যদিকে, ব্রিটেনের আইন অঙ্গনে এআই ব্যবহারের ইতিবাচক দৃষ্টান্তের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ল’ ফার্ম ‘পিনসেন্ট ম্যাসনস’ তাদের অভ্যন্তরীণ এআই ব্যবস্থার ভুল অনুসন্ধান ফলাফলের ভিত্তিতে আদালতে দুই দফা বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেছিল। পরে প্রতিষ্ঠানটি নিজ উদ্যোগে বিষয়টি ‘সলিসিটরস রেগুলেশন অথরিটি’কে জানায়।
এআইয়ের এই সাফল্য আইনি সেবাকে আরও সহজ ও কম খরচের করার সম্ভাবনা দেখালেও মানব আইনজীবীদের ভূমিকা কতটা বদলাবে, সে প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

