২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’-এর কার্যকারিতা বাড়াতে এখন আমূল সংস্কার প্রয়োজন। দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি সীমাবদ্ধতা দূর করতে ভারত ও সিঙ্গাপুরের আদলে ‘পিতামাতা ও প্রবীণ কল্যাণ কাউন্সিল’ গঠন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অবহেলাকারী সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার আইনি বিধান করা জরুরি।
ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় ফৌজদারি সাজার পাশাপাশি দেওয়ানি দায়বদ্ধতা যুক্ত করে একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ তৈরি করতে হবে। একই সাথে প্রবীণ নিবাস, দিবাযত্ন কেন্দ্র, ভলান্টিয়ার টাইম ব্যাংকিং ও কর প্রণোদনার মতো আধুনিক বিকল্প ব্যবস্থার দ্বার উন্মোচন করা আবশ্যক। মনে রাখতে হবে, পরিবার ভাঙলে রাষ্ট্র ভালো থাকবে না; যেমন—নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না। অংশীজন, নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের এই সামাজিক বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতা অনুধাবন করে যুগান্তকারী সংশোধনী গ্রহণ করা উচিত, যাতে আইনটি একটি ‘কাগুজে বাঘ’ থেকে প্রবীণদের বাস্তব সুরক্ষাকবচে পরিণত হয়।”
নূরজাহান বেগমের অমানবিক মৃত্যু নৈতিক দেউলিয়াত্বের নির্মম দলিল: সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত তিন সন্তানের ৭৫ বছর বয়সী মা নূরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ, পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি আমাদের সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক নির্মম দলিল। মৃত্যুর কয়েক দিন পরও সফল ও বিত্তবান সন্তানদের খবর না পাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন বিয়োগান্তক ঘটনা নয়; এটি আমাদের উচ্চ জিপিএ-কেন্দ্রিক ও পশ্চিমা বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা।
বৃটিশ কলোনিয়াল আমলে লর্ড ম্যাকুলে প্রণীত শিক্ষানীতির কুফল। যে শিক্ষা সন্তানকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল করতে পারে না, তা এক চটকদার অসারতা মাত্র। আজ বস্তুগত উন্নয়নের চেয়ে সন্তানের ভেতর ‘মানুষ’ হওয়ার বীজ বুনে দেওয়া বেশি প্রয়োজন, যেন আর কোনো মা-বাবাকে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন করুণ পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়। প্রথাগত পারিবারিক সুরক্ষার দীর্ঘ ইতিহাসকে আধুনিক আইনের কাঠামোয় রূপ দেওয়া আজ সময়ের দাবি।
ধর্মীয় ও সাহিত্যিক দর্পণে পিতা–মাতা: প্রতিটি ধর্মের মূল নির্যাস একটাই, পিতা-মাতা কোনো বোঝা নন, তাঁরা সন্তানের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার ও পরম তীর্থস্থান। ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা সর্বোচ্চ স্তরের। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমাদের প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে…” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)। হাদীসের আলোকে, আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। সন্তানের দায়িত্ব হলো তাঁদের জীবদ্দশায় শারীরিক-মানসিক যত্ন নেওয়া এবং মৃত্যুর পর কোরআনিক দোয়া “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা” পাঠ করা।
সনাতন শাস্ত্রেও পিতা-মাতার স্থান ঈশ্বর ও সমস্ত তীর্থের ঊর্ধ্বে। তাইত্তিরীয় উপনিষদের বাণী ‘মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব’, মা ও বাবাকে দেবতুল্য ঘোষণা করে। নিত্যদিনের প্রার্থনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পাঠ করেন: পিতৃ প্রণাম মন্ত্র ও মাতৃ প্রণাম মন্ত্র। খ্রিস্টধর্মের বাইবেলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “তোমার পিতাকে ও তোমার মাতাকে সম্মান করো” (যাত্রাপুস্তক ২০:১২)। বৌদ্ধ দর্শনেও গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, “যে সন্তান পিতা-মাতার সেবা করে, সে যেন বুদ্ধের পূজা করে।”
যুগে যুগে বিশ্বব্যাপী কবি-সাহিত্যিকরা মায়ের ভালোবাসার জয়গান গেয়েছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘মা’ কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাতীয় সংগীতে মায়ের সুধাময় বাণী, কিংবা বাউল সাধক আলম দেওয়ানের সেই আকুল গান—”মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোশ বানাইলে ও ঋণ শোধ হবে না…” সবই মায়ের ঋণকে অলঙ্ঘনীয় ঘোষণা করে। অথচ দুঃখের বিষয়, আমাদের ‘উচ্চশিক্ষিত’ প্রজন্মের একাংশ আজ এই পরম বাণীগুলোকে নিছক বইয়ের পাতায় আটকে রেখেছে, নিজেদের জীবনে ধারণ করেনি, মধ্যবিত্ত ও গরীব তো বহুদূর।
আইন পাসের ব্যাকগ্রাউন্ড ও তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতা: কোনো আইনই শূন্য থেকে তৈরি হয় না; তার পেছনে থাকে সমাজের কোনো গভীর ক্ষত। ২০১০-২০১৩ সালের দিকে দেশের জাতীয় গণমাধ্যমে বেশ কিছু মর্মন্তুদ ঘটনা সামনে আসে, যেখানে বিত্তবান সন্তানরা তাদের বৃদ্ধ, অসুস্থ মাকে গভীর রাতে রাস্তায়, ডাস্টবিনের পাশে বা হাসপাতালের বারান্দায় ফেলে রেখে পালিয়ে যেত। ফুসলিয়ে জমি-জমা বা ফ্ল্যাট নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার পরপরই সন্তান ও পুত্রবধূরা তাঁদের বাড়ি থেকে বের করে দিত। একই সাথে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা হঠাৎ করেই ‘বোঝা’ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করেন। দণ্ডবিধির সাধারণ ধারাগুলো দিয়ে এই পারিবারিক অবক্ষয় রোধ করা যাচ্ছিল না বলেই রাষ্ট্র একটি শক্ত সামাজিক প্রতিষেধক হিসেবে ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ পাস করে।
নৈতিকতাকে অপরাধ বানানোর একাডেমিক বিতর্ক: কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, পারিবারিক নৈতিকতাকে অতিরিক্ত ফৌজদারি অপরাধ বা ‘ওভার-ক্রিমিনালাইজেশন’ করা ঠিক নয়। তবে আইনশাস্ত্রে “শাস্তির অভিব্যক্তিমূলক তত্ত্ব” অনুযায়ী, যখন সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ চরমভাবে ভেঙে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে কেবল শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং সমাজকে ন্যায়-অন্যায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য ফৌজদারি আইনের চাবুক ব্যবহার করতে হয়। দেওয়ানি প্রতিকারকে আমাদের সমাজ হালকাভাবে নেয়, কিন্তু ফৌজদারি দায়বদ্ধতা একটি চূড়ান্ত সামাজিক সীমারেখা নির্ধারণ করে। তাই দ্রুত পরিবর্তনশীল এই ভোগবাদী সমাজে অসহায় পিতা-মাতা ও প্রবীণদের সুরক্ষায় শক্তিশালী ফৌজদারি প্রয়োগ একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। পাশাপাশি দেওয়ানি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করলে তাদের কল্যাণ নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায়।
বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা ও প্রায়োগিক শূন্যতা: আইনটি মানবিক উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হলেও, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এর ৭ ধারায় এক বিশাল প্রায়োগিক শূন্যতা রয়েছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো সন্তান ভরণপোষণ না দিলে সংক্ষুব্ধ পিতা-মাতাকে নিজে বেঁচে থেকে রেগুলার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হয়। তাদের অক্ষমতায়, তাদের পক্ষে, অন্য কেউ এ ধরণের আবেদন করতে পারেন না কিংবা স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে প্রশাসন বা আদালতও কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
বাস্তবতা হলো, লোকলজ্জা এবং পরম স্নেহের কারণে কোনো পিতা-মাতা শত কষ্টের মাঝেও নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে যেতে চান না। নিজের সোনাধনকে শাস্তি দিতে চান না। আর যে মায়েরা অবহেলা সইতে সইতে পরপারে চলে যান, তাঁদের মৃত্যুর পর এই আইনে দায়িত্বহীন, নির্দয়, কুসন্তানদের শাস্তি দেওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না। তদুপরি, নিয়মিত আদালতের দীর্ঘসূত্রতা প্রবীণদের শেষ সময়ের সাথে বেমানান। বাদী হিসেবে প্রতি তারিখে হাজিরা, আইনজীবীদের ফি, সন্তানের অনুপস্থিতি, সমন জারি , ওয়ারেন্ট ইস্যু ও তামিল হয়ে আসতে সূর্য বহুদূর গড়ায় কিন্তু ভরণপোষণ আর আসে না! এ ধরনের মামলা করার পর পিতা-মাতা নানা রকম হয়রানির শিকার হয়েছেন মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বিগত এক দশকের সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবর্তন এবং ২০২৬ সালের বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, প্রবীণ সুরক্ষার এই সংকট আরও বহুমাত্রিক ও জটিল রূপ নিয়েছে। বর্তমানে আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ প্রবাসে বা দূরে কর্মরত। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী সন্তানদের স্ত্রী ও সন্তানেরা দেশে থাকলেও তারা বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির ন্যূনতম যত্ন বা দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়; শহরে বা গ্রামে আধুনিক পুত্রবধূরা শ্বশুর-শাশুড়িকে ঝামেলা মনে করে। যার ফলে প্রবাসীদের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা নিজ ভূমিতে চরম অবহেলা ও দীর্ঘমেয়াদী নিঃসঙ্গতার শিকার হচ্ছেন। বিদ্যমান ২০১৩ সালের আইনটি ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রবাসী সন্তান বা দূরে কর্মরতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং তাঁদের আইনের আওতায় আনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
এছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এই আইনের অধীনে ২০২৩ সালে যে বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে, তাতে সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলনের অভাব, উপজেলা সমাজসেবা অফিসের উদাসীনতা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের আইন কার্যকর করার ক্ষমতা না থাকায় মানুষ তাদের আদেশ মানতে চায় না, পদ্ধতিগত জটিলতা পূর্ণ, মাঠপর্যায়ে কার্যকরী তদারকি বা মনিটরিং কাঠামো না থাকায় তা কার্যত একটি কাগুজে দলিলে পরিণত হয়েছে। তাই ২০১৩ সালের আইন এবং ২০২৩ সালের বিধিমালায় আমূল পরিবর্তন আবশ্যক।
বিশ্বের দরবারে: পিতামাতার প্রতি অবহেলা কীভাবে দেখা হয়?
আইনবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের প্রধান লিগ্যাল সিস্টেমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রবীণ ও পিতা-মাতার ভরণপোষণের বিষয়টি কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং তা সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১. রোমান–জার্মানিক বা সিভিল ল সিস্টেম: ইউরোপের সিংহভাগ দেশ, বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে এই আইনি ব্যবস্থা প্রচলিত, যা মূলত সংবিধিবদ্ধ লিখিত আইনের ওপর নির্ভরশীল। সিভিল ল সিস্টেমের একটি অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘পারিবারিক সংহতি বা একাত্মতা’। ফরাসি দেওয়ানি কোড এবং টার্কি-সুইস মডেলে আইনগতভাবেই সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের প্রতি আর্থিক ও সামাজিক দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। এই সিস্টেমে কোনো সন্তান অবহেলা করলে তাকে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যায়। তবে ইউরোপের শক্তিশালী ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ কাঠামোর কারণে প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার বড় একটি অংশ রাষ্ট্র নিজেই বহন করে।
২. অ্যাংলো–আমেরিকান বা কমন ল সিস্টেম: যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরসহ কমন ল ভুক্ত দেশগুলো মূলত জুডিশিয়াল প্রিসিডেন্ট বা আদালতের পূর্ববর্তী রায়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে প্রথাগত কমন ল-তে পিতা-মাতার ভরণপোষণের সরাসরি কোনো সাধারণ আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় সংবিধিবদ্ধ আইনের মাধ্যমে এই শূন্যতা পূরণ করা হয়েছে।
যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৬টি অঙ্গরাজ্যে ‘ফিলিয়াল রেসপন্সিবিলিটি ল’ রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রবীণদের নার্সিং হোম বা চিকিৎসার খরচ মেটাতে সন্তানদের আইনিভাবে বাধ্য করা যায়। একইভাবে ভারত ও সিঙ্গাপুরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আইন পাস করে কমন ল-র প্রথাগত জটিলতার বাইরে গিয়ে প্রবীণদের জন্য দ্রুত আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতে ‘মেইনটেন্যান্স অব প্যারেন্টস এন্ড সিনিয়র সিটিজেন্স অ্যাক্ট ২০০৭’ অনুযায়ী, সাব-ডিভিশন ভিত্তিক বিশেষ ‘ভরণপোষণ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতি মাসে ভাতা প্রদানের নির্দেশ দিতে পারে এবং অবহেলার কারণে বাবা-মায়ের লিখে দেওয়া সম্পত্তি বাতিলের ক্ষমতাও এই ট্রাইব্যুনালের রয়েছে। সিঙ্গাপুরে ‘মেইনটেন্যান্স অব প্যারেন্টস অ্যাক্ট ১৯৯৫’ (২০১০ ও ২০২৩ সংশোধিত)-এর মাধ্যমে ‘কন্সিলিয়েশন-ফার্স্ট’ নীতিতে আইনজীবী ছাড়াই প্রবীণরা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত আবাসন ও আর্থিক অধিকার লাভ করেন।
৩. সমাজতান্ত্রিক বা সোশ্যালিস্ট ল সিস্টেম: চীন, উত্তর কোরিয়া বা কিউবার মতো সমাজতান্ত্রিক আইনি ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই সিস্টেমে প্রবীণদের অধিকার সরাসরি সংবিধানেই মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। যেমন—চীনের আধুনিক সমাজতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর অধীনে ২০১৩ সালে প্রণীত ‘এলডারলি রাইটস ল’ কেবল আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে বাবা-মায়ের মানসিক ও আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টির জন্য সন্তানদের “প্রায়শই” দেখতে যাওয়া বাধ্যতামূলক এবং অবহেলা করলে রাষ্ট্র কর্তৃক কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এখানে পারিবারিক নৈতিকতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম রাজনৈতিক এজেন্ডা।
৪. ধর্মীয় আইনি ব্যবস্থা: ইসলামি শরিয়াহ্ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচলিত ধর্মীয় আইনি ব্যবস্থায় পিতা-মাতার অধিকারকে সর্বোচ্চ প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক স্তরে রাখা হয়েছে। এখানে ভরণপোষণ বা নাফাকাহ কেবল নৈতিক আচরণ নয়, এটি একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা। সন্তান সামর্থ্যবান হলে এবং পিতা-মাতা অভাবগ্রস্ত হলে, কাজি বা আদালত সরাসরি সন্তানের সম্পত্তি থেকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার আদেশ দিতে পারেন। সনাতন বা হিন্দু আইনের ক্ষেত্রেও জিম্মুতবাহন বা মিতাক্ষরা দর্শনের অধীনে পরিবারের প্রবীণ ও পিতা-মাতার আজীবন ভরণপোষণ নিশ্চিত করা সন্তানের পরম আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
৫. দূরপ্রাচ্যের প্রথাগত আইনি ব্যবস্থা: জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে কনফুসীয় দর্শনের গভীর প্রভাব রয়েছে, যা গুরুজনদের প্রতি ভক্তি বা ‘ফিলিয়াল পাইটি’ দ্বারা চালিত। যদিও আধুনিকায়নের ফলে এই প্রথাগত ব্যবস্থা আইনি রূপ নিয়েছে। জাপানের ২০২৪ সালের ‘লোনলিনেস অ্যান্ড আইসোলেশন কাউন্টারমেজারস অ্যাক্ট’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক ‘গো হারা আইন’ প্রথাগত পারিবারিক মূল্যবোধের সাথে আধুনিক দেওয়ানি ও প্রশাসনিক আইনের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছে। এই সমাজগুলোতে প্রবীণদের অবহেলা করাকে সামাজিক ও আইনিভাবে একটি চূড়ান্ত অবক্ষয় হিসেবে দেখা হয়। ‘গো হারা আইনে সন্তানকে অবহেলাকারী পিতা-মাতাকে বা পিতা-মাতাকে অবহেলাকারী সন্তানকে মরণোত্তর বিচারের মাধ্যমে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার আইনি বিধান করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী সংকট নিরসনে সমন্বিত ‘হাইব্রিড মডেল‘ প্রস্তাবনা: সাম্প্রতিক নুরজাহান বেগমের প্রতি উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের চরম অবহেলার ঘটনা ভাইরাল হয়েছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সমাজের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ আইনগত পদক্ষেপ ও অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। বর্তমানে মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দেওয়াল ভাঙার জন্য বিদ্যমান আইনের ‘ওভার-ক্রিমিনালাইজেশন’ (সরাসরি ফৌজদারি অপরাধে রূপান্তর) ও প্রথাগত দেওয়ানি দীর্ঘসূত্রতা—উভয় সীমাবদ্ধতা দূর করতে দেওয়ানী ও ফৌজদারি ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি যুগান্তকারী সমন্বিত ‘হাইব্রিড মডেল’ বা মিশ্র আইনি কাঠামো গ্রহণে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করছি।
এখানে ‘হাইব্রিড মডেল’ বলতে মূলত একই সাথে দেওয়ানি ও ফৌজদারি ধারার এমন এক চমৎকার আইনি সমন্বয়কে বোঝাবে, যা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের সফল মডেলগুলোর সফল অনুসরণে আমাদের নিজস্ব সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর উপযোগী করে নকশা করা হয়েছে। এই মডেলের মূল দর্শন হলো—সরাসরি ফৌজদারি আদালতের কাঠগড়ায় না নিয়ে, বিষয়টিকে প্রথমে দেওয়ানি ও প্রশাসনিক রূপ দেওয়া হবে। অর্থাৎ, পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে ভরণপোষণ আদায়ের জন্য প্রথমে সিঙ্গাপুর ও ভারতের আদলে দেওয়ানি ও সালিশি প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হবে।
১. হাইব্রিড মডেল: পিতা–মাতা ও প্রবীণ কল্যাণ কাউন্সিল: কোর্ট কাচারির পরিবর্তে কল্যাণ কাউন্সিল শব্দগত তারতম্যের কারণে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন হবে, ভয় ও লজ্জার জায়গায় এখানে আসা সহজ হবে। প্রতিটি উপজেলায় পিতা-মাতা ও প্রবীণ কল্যাণ কাউন্সিল থাকবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা সহকারী কমিশনার-ভূমি (সভাপতি), উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা (সদস্য-সচিব), লিগ্যাল এইড অফিসার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, একজন নারী শিক্ষক ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের নিয়ে এটি গঠিত হবে।
এসব কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য আইনজীবী বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে স্বেচ্ছাসেবক বা ভলান্টিয়ার থাকতে পারে। প্রয়োজনমতো প্রতিমাসে একটি বা দুটি সেশন হতে পারে। সরাসরি ফৌজদারি আদালতে মামলা না করে বিষয়টিকে প্রথমে দেওয়ানি রূপে সমাধানের আদেশ হবে। এই দেওয়ানি ও প্রশাসনিক নির্দেশ যদি কোনো সন্তান ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করে, কেবল তখনই ত্বরিত প্রতিষেধক হিসেবে ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর ব্যাকআপ নিয়ে তাৎক্ষণিক কঠোর ফৌজদারি সাজা প্রয়োগ করা হবে। ফৌজদারি আইনের শক্ত প্রতিরোধক ক্ষমতার সাথে দেওয়ানি প্রক্রিয়ার নমনীয়তার এই মিশ্রণই পারে পিতা-মাতা ও প্রবীণদের প্রকৃত সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা প্রয়োগ করলে ফৌজদারি আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
হাইব্রিড মডেলে এই কাউন্সিল ইউএনও কার্যালয়ে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে সম্পর্ক রক্ষা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবে। পিতা মাতার প্রয়োজন ও সন্তানের সামর্থ বিবেচনায় ভরণপোষণ নির্ধারিত হবে। সন্তান সক্ষম হলে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বেতন থেকে সরাসরি টাকা কাটার ‘অটো-ডেবিট’ আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কাউন্সিলের থাকবে। প্রবাসী সন্তানদের ক্ষেত্রে অনলাইন শুনানিতে যুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং নির্দেশ অমান্য করলে পাসপোর্ট বা কনস্যুলার সেবা ব্লক করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকবে। প্রবাসী সন্তানদের ক্ষেত্রে পুত্রবধূদের দায়িত্ব পালনের জন্য জবাবদিহিতায় আনার ব্যবস্থা করা।
২. তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নে মোবাইল কোর্টের ব্যাকআপ: এই দেওয়ানি প্রক্রিয়া সন্তান ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করলে, কেবল তখনই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত ক্ষমতার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করে কারাদণ্ড দিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে এই আইনকে মোবাইল কোর্টে আইনের তফসিলভুক্ত করতে হবে।
৩. অভিযোগ দায়েরকারীর আওতা বৃদ্ধি: পিতা-মাতার পাশাপাশি তাদের মনোনীত বা সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি, সন্তানের কোন একজন, নিকটাত্মীয় কোন একজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মানবাধিকার সংস্থা বা স্থানীয় প্রশাসন বা কল্যাণ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সরাসরি মামলা দায়েরের বিধান আনতে হবে। নূরজাহান বেগমের মতো ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে মৃত্যুর পরেও ভূতাপেক্ষ দেওয়ানি কার্যকারিতায় মামলা দায়েরের সুযোগ থাকতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার গো-হারা আইনের মত অবহেলাকারী সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা। একইভাবে সন্তানের প্রতি অবহেলাকারী পিতামাতাকেও দায়বদ্ধ করার সুযোগ থাকবে। ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সন্তানের প্রতি অবহেলার কারণে তা নেতিবাচক হিসেবে কাজ করবে।
৪. শাস্তি ও জরিমানা পরিবর্তন: বর্তমান আইনের ৫ ধারার শাস্তি ও জরিমানা পরিবর্তন করতে হবে। পিতা-মাতা ও প্রবীণদের কল্যাণের প্রতি খেয়াল রেখে, ২০২৬ সালের বাজারমূল্য ও অপরাধ প্রতিরোধের স্বার্থে এই সাজা ন্যূনতম ৬ মাস থেকে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা ন্যূনতম ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা বা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরো বাড়ানো সমীচীন, যা ভুক্তভোগীদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা তহবিলে ব্যবহৃত হবে। দরিদ্র অক্ষম বা অপারগদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকা দরকার। সন্তান নিজেই দরিদ্র বা উপার্জনে অক্ষম হলে তার ওপর জরিমানা চাপানো মূলত ‘দারিদ্র্যকেই অপরাধে রূপান্তর’ করার শামিল। তাই কাউন্সিলের মাধ্যমে সন্তানের সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য ‘মিন্স টেস্ট’ করা হবে। সন্তান অক্ষম প্রমাণিত হলে রাষ্ট্র ‘প্যারেন্ট অব দ্য নেশন’ হিসেবে এগিয়ে আসবে এবং বিশেষ প্রবীণ তহবিলের আওতায় রাষ্ট্রীয় ভাতার ব্যবস্থা করবে।
৫. বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ ও উৎসাহিতকরণ: কেবল কঠোর আইনি বিধি-নিষেধ বা শাস্তি দিয়ে প্রবীণদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি মানবিক ও টেকসই বিকল্প সামাজিক সুরক্ষা বলয়। আরও কিছু কার্যকারী ও আধুনিক বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পিতা-মাতা ও প্রবীণদের সুরক্ষা বলয় আরো শক্তিশালী হতে পারে।
ক) প্রবীণ নিবাস পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা: সরকারের উচিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত মানসম্মত ‘প্রবীণ নিবাস’, বৃদ্ধাশ্রম, ওল্ড কেয়ার হোম স্থাপন ও পরিচালনায় বেসরকারি খাতকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা, কর রেয়াত এবং স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে খাস জমি বরাদ্দ দেওয়া। এর ফলে সমাজের ধনাঢ্য দানশীল ব্যক্তিত্ব, কর্পোরেট সিএসআর ফান্ড এবং দেশি-বিদেশি অলাভজনক বেসরকারি সংস্থাগুলো এই মহৎ ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে।
আমাদের সমাজে প্রবীণ নিবাসের প্রতি একটি গভীর নেতিবাচক ট্যাবু রয়েছে। অনেকেই মনে করেন পিতা-মাতাকে সেখানে পাঠানো মানেই সন্তানের চরম অবহেলা। কিন্তু বর্তমানের জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক ও প্রবাস জীবনের বাস্তবতায় এই একপেশে মানসিকতা পরিবর্তনের সময় এসেছে। পারিবারিক কলহ বা তীব্র একাকিত্বে ঘরের চার দেওয়ালে তিল তিল করে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে, পিতা-মাতার স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটি আধুনিক প্রবীণ নিবাসে থাকা তাঁদের জন্য অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ ও সুখকর হতে পারে। সেখানে তাঁরা সমবয়সী সামাজিক পরিবেশ, সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের সুযোগ পান।
তবে এর জন্য আইনি সুরক্ষা থাকতে হবে। আইন সংশোধন করে এই সুযোগ কেবল তখনই দেওয়া উচিত, যখন পিতা-মাতা নিজে সম্মত হবেন। একই সাথে, সন্তান কর্তৃক নিবাসের যাবতীয় খরচ বহন করা এবং আইনি অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে “নিয়মিত পিতা-মাতাকে সশরীরে দেখতে যাওয়া বা খোঁজ নেওয়া” বাধ্যতামূলক করতে হবে। সুতরাং, প্রবীণ নিবাস মানেই ‘পরিত্যাগ’ নয়; বরং সন্তানের দায়িত্বশীলতা ও নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে এটি হতে পারে বার্ধক্যের একটি নিরাপদ বিকল্প আশ্রয়। বাস্তবতাকে মেনে এই ব্যবস্থার প্রতি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখন ইতিবাচক করা প্রয়োজন।
খ) প্রবীণ নিবাসে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতি: প্রবীণ নিবাসগুলোকে কেবল ‘নিষ্ক্রিয় অপেক্ষালয়’ না বানিয়ে সেগুলোকে উৎপাদনশীল কেন্দ্রে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। নিবাসগুলোতে হালকা ও নিরাপদ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (যেমন: হস্তশিল্প, হস্তচালিত তাঁত, জৈব কৃষিকাজ, নার্সারি, কুটির শিল্পের প্যাকেটজাতকরণ বা বই বাঁধাই) স্থাপন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে প্রবীণদের মাঝে যারা শারীরিকভাবে কিছুটা কর্মক্ষম, তাঁরা একদিকে যেমন অর্থ উপার্জন করে স্বাবলম্বী হতে পারবেন, অন্যদিকে তাঁদের একাকিত্ব দূর হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মমর্যাদা বজায় থাকবে। এখান থেকে প্রাপ্ত আয় সন্তান ও রাষ্ট্রের উপর আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
গ) ডে–কেয়ার সেন্টার বা ‘প্রবীণ দিবাযত্ন কেন্দ্র’: অনেক পরিবারে সন্তান ও পুত্রবধূ কর্মজীবী হওয়ায় দিনের বেলা প্রবীণরা চরম একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এর বিকল্প হিসেবে প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপজেলা পর্যায়ে ‘প্রবীণ দিবাযত্ন কেন্দ্র’ গড়ে তোলা যেতে পারে। যেখানে সন্তানরা সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় প্রবীণদের রেখে যাবেন এবং বিকেলে ফেরার পথে সাথে করে নিয়ে আসবেন। এর ফলে পারিবারিক বন্ধনও অটুট থাকবে, আবার দিনের বেলায় প্রবীণরা চিকিৎসা, বিনোদন ও সমবয়সীদের সঙ্গ পাবেন।
ঘ) ‘টাইম ব্যাংক’ বা প্রবীণ সেবা ক্রেডিট সিস্টেম: সুইজারল্যান্ড, জাপান ও সিঙ্গাপুরের আদলে বাংলাদেশে ‘টাইম ব্যাংক’ ধারণা চালু করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা একাকী প্রবীণদের সময় দেওয়া, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া বা বাজার করে দেওয়ার মতো স্বেচ্ছাসেবী কাজ করবেন। এই কাজের প্রতি ঘণ্টা তাঁদের প্রোফাইলে ‘টাইম ক্রেডিট’ হিসেবে জমা থাকবে। ভবিষ্যতে এই তরুণরা যখন বৃদ্ধ হবেন বা তাঁদের পরিবারে যখন সহায়তার প্রয়োজন হবে, তখন রাষ্ট্র বা সমাজ এই জমানো ক্রেডিটের বিপরীতে তাঁদের বিনামূল্যে প্রবীণ সেবা প্রদান করবে।
ঙ) ‘প্রবীণ সহায়ক’ মোবাইল অ্যাপ ও হেল্পলাইন: জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা বা মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং-এর জন্য একটি জাতীয় ‘প্রবীণ হেল্পলাইন’ (যেমন: ৩৩৩ বা ১০৯-এর মতো ডেডিকেটেড নম্বর) এবং একটি ওয়ান-স্টপ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালু করা আবশ্যক। একাকী বসবাসকারী প্রবীণরা যেকোনো বিপদে বা নিঃসঙ্গতায় এই অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক স্থানীয় প্রশাসন বা কাউন্সিলের ভলান্টিয়ারদের যুক্ত করতে পারবেন।
চ) করপোরেট ও পেনশন সংস্কার: যেসব চাকরিজীবী সন্তান তাঁদের অবাতিলযোগ্য আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্টে বরাদ্দ রাখবেন, তাঁদের জন্য বিশেষ আয়কর ছাড়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া প্রবীণদের বিনামূল্যে যাতায়াত এবং সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য ‘হেলথ কার্ড’ ইস্যু করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, শেকড় বিচ্ছিন্ন আধুনিকতা আমাদের অন্ধ করে দিচ্ছে। নূরজাহান বেগমদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের বিবেককে যে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেল, তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় এই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কার। রাষ্ট্র পিতা-মাতা ও প্রবীণদের সুরক্ষায় একটি ঢাল ও লাঠি উভয় হিসেবে দাঁড়িয়ে সমাজকে বার্তা দিক যে পিতা-মাতার যত্ন নেওয়া কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও ধর্মের অলঙ্ঘনীয় বিধান, ব্যর্থতায় অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড অনিবার্য। মনে রাখতে হবে, পরিবার ভাঙলে রাষ্ট্র ভালো থাকবে না; যেমন—নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না। অংশীজন, নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের এই সামাজিক বাস্তবতা ও দায়বদ্ধতা অনুধাবন করে যুগান্তকারী সংশোধনী গ্রহণ।

