কোনো নারী কর্মীকে দুইবারের বেশি মাতৃত্বকালীন ছুটি না দেওয়া এবং কোনো প্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের কম সময় চাকরি করলে মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার বিধানের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মজীবী নারীদের জন্য সমান মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
সোমবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।
রুলে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৪৬(২) ধারা, ৪৬(১) ধারার প্রভিসো এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ১৯৭ নম্বর বিধির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আদালত জানতে চেয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা সীমিত করার এসব বিধান কেন সংবিধানের ৭, ১৫, ১৮, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
একই সঙ্গে সরকার কেন সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মজীবী নারীদের জন্য সমান মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কেন একটি অভিন্ন মাতৃত্বকালীন নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে না—সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান, মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান ও ইফাত হাসান শাম্মি।
গত ১৫ জুন কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করা হয়। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ মোট ১২ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; বরং এটি মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য, মর্যাদা, সমতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে কোনো কর্মজীবী নারীকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের সমতার নীতির পরিপন্থী।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। এর ফলে একই ধরনের কর্মে নিয়োজিত নারীরা ভিন্ন সুবিধা পাচ্ছেন, যা আইনের সমান সুরক্ষা ও সমঅধিকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, কর্মজীবী সব নারীর জন্য বৈষম্যহীন ও সমান মাতৃত্বকালীন অধিকার নিশ্চিত করাই এই রিটের মূল উদ্দেশ্য। তাঁর ভাষ্য, মাতৃত্ব কোনো শাস্তি বা সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সুরক্ষার অংশ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মামলার চূড়ান্ত রায় কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং শ্রম আইনে সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে দেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের মাতৃত্বকালীন ছুটির নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মজীবী নারীদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এ রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

