বাংলাদেশের সরকারি ও ময়নাতদন্ত পরিচালনাকারী হাসপাতালগুলোতে মৃত নারীদের মরদেহের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ধর্মীয় বিধান রক্ষায় প্রতিটি মর্গে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মর্গে মরদেহের প্রতি যেকোনো ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক আচরণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আবেদন জানানো হয়েছে।
আজ সোমবার (১৩ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট দায়ের করেন। এতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে দেশের যেসব হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়, সেখানে অন্তত একজন করে নারী ডোম নিয়োগের উদ্যোগ নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে আইনি আবেদন করেছিলেন ওই আইনজীবী। তবে দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিষয়টি আদালতের নজরে আনতে তিনি জনস্বার্থে রিট দায়ের করেন।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে মৃত নারীদের মরদেহ সম্মান ও গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালনা করা প্রয়োজন। ময়নাতদন্ত একটি আইনগত প্রক্রিয়া হলেও, এ সময় নারীর মরদেহের মর্যাদা রক্ষা এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনা, হত্যা বা অন্য কোনো আকস্মিক ঘটনায় কোনো নারীর মৃত্যু হলে তার পরিবার গভীর মানসিক সংকটের মধ্যে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ময়নাতদন্তের মতো স্পর্শকাতর কাজে নারী ডোম দায়িত্ব পালন করলে স্বজনদের উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট অনেকটাই কমতে পারে।
রিটে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে নারীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী ডোম নিয়োগ দেওয়া হলে একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতাও বজায় থাকবে। আবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একজন মানুষের মৃত্যুর পরও তার মরদেহের প্রতি সম্মান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
রিটে অতীতে দেশের কয়েকটি মর্গে মৃত নারীর মরদেহের প্রতি অপরাধমূলক আচরণের অভিযোগের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এক তরুণীর মরদেহ নিয়ে অনৈতিক আচরণের অভিযোগে এক ডোমকে গ্রেপ্তারের ঘটনা এবং ২০২০ সালে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে একই ধরনের অভিযোগে আরেক কর্মীকে গ্রেপ্তারের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক একটি উদাহরণ তুলে ধরে আবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশেও মর্গে দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মৃত নারীদের মরদেহের প্রতি গুরুতর অপরাধমূলক আচরণের নজির রয়েছে। এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।
রিটকারী আইনজীবীর দাবি, মৃত নারীদের মরদেহের সম্মান, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি ময়নাতদন্ত কেন্দ্রে দ্রুত নারী ডোম নিয়োগ এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি এ বিষয়ে আদালতের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা কামনা করেছেন।

