বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ নামের এই আইনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাকে নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এতদিন যৌন হয়রানি প্রতিরোধে মূলত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং বিদ্যমান বিভিন্ন আইনের বিচ্ছিন্ন বিধানের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নতুন আইন কার্যকর হলে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, শাস্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কোনো আইনের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু এর ধারা বা বিধানের ওপর নয়, বরং বাস্তবে সেটি কতটা প্রয়োগ করা যাচ্ছে তার ওপর। জাতীয় সংসদে বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার আগে এর প্রতিটি দিক সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থেকে আইনের পথে:
সাধারণত একটি আইন তৈরি হয় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিন্তু কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়েছিল আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে।
২০০৯ সালে একটি জনস্বার্থমূলক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ দেশের সব কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আদালত যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করেন, যা সংসদে আইন না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে আদালত এই নির্দেশনার পরিধি আরও বাড়িয়ে রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, স্টেশন, বাজার ও বিমানবন্দরের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানকেও এর আওতায় আনেন।
এই নির্দেশনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছিল, যৌন হয়রানি শুধু ব্যক্তিগত আচরণের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, সামাজিক সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বিষয়। তাই এর প্রতিরোধে শুধু ব্যক্তির নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও দায় রয়েছে।
হাইকোর্টের নির্দেশনার পর প্রায় দেড় দশক পার হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ ছিল সীমিত। কিছু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠন করা হলেও দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় এর কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। নির্দিষ্ট আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং তদারকি ব্যবস্থার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। নতুন আইনে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যৌন হয়রানির সংজ্ঞায় পরিবর্তন:
প্রস্তাবিত আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যৌন হয়রানির বিস্তৃত সংজ্ঞা। খসড়ার ২(জ) ধারায় বিষয়টিকে শুধু শারীরিক স্পর্শ বা প্রকাশ্য অশালীন আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।
নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো আচরণ যদি কোনো ব্যক্তির জন্য অনিরাপদ, ভয়ভীতিকর, অস্বস্তিকর, বিব্রতকর বা অপমানজনক পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে শারীরিক স্পর্শ না হলেও তা যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচলিত অনেক ধরনের পরোক্ষ হয়রানিও আইনি কাঠামোর মধ্যে আসার সুযোগ তৈরি হবে।
খসড়া আইনে ‘সার্ভাইভার-কেন্দ্রিক পদ্ধতি’ যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে অভিযোগকারী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা, সম্মান এবং গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতির আওতায় অভিযোগ তদন্তের সময় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, পরিচয় গোপন রাখা এবং লিঙ্গ বা পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ জানানোর পর সামাজিক চাপ, পরিচয় প্রকাশ বা প্রতিশোধের আশঙ্কা অনেক সময় ভুক্তভোগীদের পিছিয়ে দেয়। তাই অভিযোগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্রস্তাবিত আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আইন কার্যকর হওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ‘অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি’ গঠন করতে হবে।
অভিযোগ তদন্ত শেষে কমিটি অপরাধের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় বিভিন্ন শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে সতর্কীকরণ, তিরস্কার, বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি স্থগিত, ক্ষতিপূরণ প্রদান, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে সুপারিশ বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থদণ্ড, দুই মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনটি অনেক দিক থেকে যুগোপযোগী হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ২০ জনের কম কর্মী রয়েছে এমন ছোট প্রতিষ্ঠান ও অসংগঠিত খাতে নিজস্ব অভিযোগ কমিটি গঠন করা কঠিন হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে ‘স্থানীয় অভিযোগ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে মাঠ প্রশাসনের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে এসব কমিটি কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রয়োজন শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা:
আইন কার্যকর করতে শুধু বিধান থাকলেই হবে না, প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা। জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব ইতিবাচক হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ কমিটি সক্রিয় রাখছে কি না, তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না এবং আইনগত দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। একটি কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা থাকলে আইনের প্রয়োগের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
আইন পাসের আগে প্রয়োজন আরও পর্যালোচনা:
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি শুধু একটি আইন নয়, বরং নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে আইনের শক্তি নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। সংসদে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে অংশীজনদের মতামত, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হলে আইনটি আরও কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
- লেখক: বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতিবিশেষজ্ঞ

