জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত প্রায় দুই বছরে ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। তবে মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিচার কার্যক্রমের গতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে ২০টি মামলা। পাশাপাশি ৩৮টি অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং আরও অর্ধশতাধিক অভিযোগ তদন্তের জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছে।
এর বাইরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে জমা রয়েছে কয়েক শ অভিযোগ। ফলে সামনে মামলার সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসিকিউশন সূত্র বলছে, একটি মামলা নিষ্পত্তি করতে কয়েক মাস সময় লাগছে। এ অবস্থায় মামলার চাপ বাড়লে বিচার শেষ হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তবে জুলাই শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা ও ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার প্রত্যাশা করছেন। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে মামলার সংখ্যা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক চিফ প্রসিকিউটররা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জানান, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউটর, তদন্ত কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সহায়তা বাড়ানো হবে।
ছয় মামলায় সাজা ৬২ জনের:
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ ওই সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পরে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছরের ৮ মে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠন করা হয় দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল।
বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে করা কিছু মামলার বিচার চলছে। এ পর্যন্ত দুই ট্রাইব্যুনালে তিনটি করে মোট ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬২ জন বিভিন্ন মেয়াদের সাজা পেয়েছেন।
প্রথম রায় আসে গত বছরের ১৭ নভেম্বর। জুলাই-আগস্টের দেশব্যাপী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এরপর রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জন হত্যার ঘটনায় করা মামলায় চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় আরও পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং দুজন হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ২৮ জুন ট্রাইব্যুনাল-১ হাবিবুর রহমানসহ তিন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ মামলায় একজনকে যাবজ্জীবন এবং একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল-২ সাভারের আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় করা মামলায় ৫ ফেব্রুয়ারি ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেন। ওই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক এএসআই আবজালুর রহমানকে ক্ষমা করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার মামলায় ৯ এপ্রিল পুলিশের সাবেক দুই কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডের মামলায় ৩০ জুন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
বাড়ছে বিচারাধীন মামলার চাপ:
প্রসিকিউশন সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১-এ ১৫টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ পাঁচটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তদন্তাধীন ৫৮টি মামলায় আসামির সংখ্যা ৩৯৪ জন। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ১৪৭ জন। বাকিরা পলাতক।
আসামিদের তালিকায় শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা এবং পুলিশের সদস্যদের নাম রয়েছে। কয়েকজন একাধিক মামলার আসামি।
এদিকে আদালত অবমাননার মামলায় শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের মামলায় গাইবান্ধার শাকিল আকন্দ বুলবুলকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে যুবলীগ নেতা এম এইচ পাটোয়ারীকে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-২ কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় অপেক্ষমাণ রেখেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে করা মামলায় চলছে যুক্তিতর্ক।
বাড়তে পারে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের আরও অনেক ঘটনার বিচার ট্রাইব্যুনালে আসতে পারে। ফলে মামলার সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, ৫৯০টি অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর ১০৯টি অভিযোগ তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর বিচার বর্তমানে চলছে।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য, একটি মামলা শেষ করতে তিন থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে। বর্তমানে প্রতিদিন একাধিক মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে দুই ট্রাইব্যুনালের ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি বলেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রসিকিউশন টিম ও তদন্ত কর্মকর্তার সংখ্যাও বাড়াতে হবে।
একই মত দিয়েছেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টে প্রাণ হারানোদের পরিবার ও আহতরা দ্রুত বিচার দেখতে চান। মামলার সংখ্যা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আপিল নিষ্পত্তিতেও সময় লাগবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন:
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা হয়েছে। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হিসেবে শেখ হাসিনা, সাবেক দুই আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহীদুল হকসহ ৪১ জনের নাম রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত অপরাধ এবং আগের বিভিন্ন ঘটনার তদন্তে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হলে এসব বিষয়েও ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হতে পারে।

