আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করতে চালু হয়েছে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম। বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি আদালতের ওপর চাপ কমাতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
গতকাল মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চ্যুয়ালি দেশের ১০টি নির্বাচিত জেলায় এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী বলেন, মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজ পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে আদালতে নতুন মামলা দায়েরের প্রবণতা কমাতেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ বিশাল মামলার চাপ বিচার ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আদালতে যাওয়ার আগেই বিরোধ সমাধানের সুযোগ তৈরি করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও অতিরিক্ত খরচ কমবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।
১০ জেলায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম শুরু:
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ২১খ ধারার বিধান অনুযায়ী নতুন করে ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো—বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল।
এসব জেলায় এখন থেকে নির্ধারিত সাতটি আইনের আওতায় কোনো মামলা আদালতে দায়ের করার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে বিনামূল্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থাৎ আদালতে মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বিরোধ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
আইনমন্ত্রী জানান, দেশের ২০টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা চালুর পর এর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত আইনের আওতায় মামলা ৩ হাজার ৫৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৪৪টিতে দাঁড়িয়েছে। এতে মামলা কমেছে প্রায় ৫১ শতাংশ। বণ্টন মামলা (সিভিল জজ আদালত) ২ হাজার ১টি থেকে কমে ৬৬১টিতে নেমেছে, যা প্রায় ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ হ্রাস।
স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন সংক্রান্ত মামলা ১৭টি থেকে কমে হয়েছে মাত্র ২টি। এ ক্ষেত্রে কমেছে প্রায় ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ ছাড়া যৌতুক নিরোধ আইন, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইন এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনের মামলাতেও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে নতুন মামলা দায়ের।
অনুষ্ঠানে কক্সবাজার জেলার বিচারাধীন মামলার বিষয়েও কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে জেলায় এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তিনি জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের আগামী তিন মাসের মধ্যে মামলাজট কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন বলেও জানান তিনি।
মধ্যস্থতাকারীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, এই দায়িত্ব শুধু পেশাগত কাজ হিসেবে নয়, জনগণের সেবা ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে পালন করতে হবে। একই সঙ্গে লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতা কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।
মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা (JICA), জিআইজেড (GIZ) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

