রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো সংসদ সদস্য (এমপি) যদি নিজ রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হন, তাহলে কি তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্যপদও হারান? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রাসঙ্গিক বিধানগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার পর নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যপদ হারাতে পারেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সংবিধানে “দল থেকে বহিষ্কার” এবং “দল থেকে পদত্যাগ”—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা হয়নি।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য— যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেন বা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করেন, তাহলে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, সদস্যপদ হারানোর সাংবিধানিক ভিত্তি হলো স্বেচ্ছায় দলত্যাগ বা দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে সংসদে অবস্থান গ্রহণ; দল কর্তৃক বহিষ্কার নয়।
অন্যদিকে, অনুচ্ছেদ ৬৬-এ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে, আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ (unsound mind) ঘোষিত হলে, দেউলিয়া (undischarged insolvent) হলে অথবা আইনে নির্ধারিত অন্য কোনো অযোগ্যতার মধ্যে পড়লে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংবিধানের কোথাও “দল থেকে বহিষ্কার”-কে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের স্বয়ংক্রিয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক দল যদি সাংগঠনিক কারণে একজন সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কারও করে, তবুও কেবল সেই কারণেই তাঁর সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়—এমন বিধান সংবিধানে নেই।
এ কারণে একজন সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও, তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনে বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে।
এক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(ঘ) এবং রুল ১৭৮ অফ রুলস এন্ড প্রসিজার অফ জাতীয় সংসদ– এ বলা হয়েছে, কোন সাংসদের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে শুনানী ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হয় এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
এটিও মনে রাখা জরুরি যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি একক সিদ্ধান্তে একজন সংসদ সদস্যের সংসদীয় আসন কেড়ে নিতে পারে না। সংসদ সদস্যপদ হারানোর বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে সংবিধাননির্ভর এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান একজন সংসদ সদস্যের সদস্যপদ হারানোর নির্দিষ্ট কারণগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কার এবং দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ—এই দুটি বিষয় এক নয়। ফলে কেবল দলীয় বহিষ্কারকে সংসদ সদস্যপদ হারানোর স্বয়ংক্রিয় কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ সংবিধানে স্পষ্টভাবে নেই। এই প্রশ্নে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ভর করবে সংবিধানের ব্যাখ্যা, প্রাসঙ্গিক আইন এবং প্রয়োজনে আদালত ও নির্বাচন কমিশনের ওপর।
- জয়দীপ ঘোষ এলিন: নিউজ এডিটর, সিটিজেন্স ভয়েস।

