একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এর প্রভাব ইতোমধ্যে মানুষের জীবন, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান। তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনা অর্থনীতির জন্য নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চল ঝুঁকিতে পড়ছে, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও জ্বালানি ব্যবহারের বিস্তারের ফলে দূষণ, বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণও বাড়ছে। ফলে উন্নয়নের অর্থ এখন শুধু উৎপাদন ও আয় বাড়ানো নয়; সেই উন্নয়ন কতটা পরিবেশবান্ধব, স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ—সেটিও বিবেচনার বিষয়।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতের দায়িত্বও বেড়েছে। কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংক যদি অর্থের প্রবাহ এমন প্রকল্পের দিকে পরিচালিত করে, যেগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ী, দূষণ কমায়, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করে এবং একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। এই ধারণারই আধুনিক রূপ হলো সবুজ ব্যাংকিং।
সবুজ ব্যাংকিং কী? সবুজ ব্যাংকিংকে অনেক সময় কাগজের ব্যবহার কমানো, অনলাইন ব্যাংকিং চালু করা কিংবা ব্যাংকের কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সঙ্গে এক করে দেখা হয়। এগুলো অবশ্যই সবুজ ব্যাংকিংয়ের অংশ, তবে এর পরিধি আরও বিস্তৃত।
প্রকৃত অর্থে সবুজ ব্যাংকিং হলো এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কোনো প্রকল্পের পরিবেশগত, সামাজিক ও জলবায়ুগত প্রভাব বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রকল্পে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো হয়।
এর প্রথম দিক হলো ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব করা। বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় কমানো, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, কাগজের পরিবর্তে ডিজিটাল নথি ব্যবহার, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা এর অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয় দিক হলো সবুজ অর্থায়ন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তরল বর্জ্য শোধনাগার, পরিবেশবান্ধব ভবন, পানি সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ ও বিনিয়োগ করা এর মূল উদ্দেশ্য।
তৃতীয় দিক হলো পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। কোনো প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার আগে সেটি পরিবেশের কতটা ক্ষতি করতে পারে, স্থানীয় মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটি ভবিষ্যতে কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ ব্যাংকের দায়িত্ব এখন শুধু ‘কে ঋণ ফেরত দিতে পারবে’ তা যাচাই করা নয়; বরং ‘কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করলে অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ—তিনটিই লাভবান হবে’ সেটিও বিবেচনা করা।
বিশ্বে সবুজ অর্থায়নের বিস্তার। গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী সবুজ অর্থায়নের ধারণা দ্রুত বিকশিত হয়েছে। ২০০৯ সালের কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলন থেকে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি এবং পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্ব পেয়েছে।
কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু সরকারি নীতি বা আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। এ কারণে সবুজ বন্ড, টেকসই বন্ড, জলবায়ু তহবিল এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ঋণের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রণী। পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করতে তারা ‘ইইউ ট্যাক্সোনমি’ প্রণয়ন করেছে। এর মাধ্যমে কোন কর্মকাণ্ডকে পরিবেশগতভাবে টেকসই বলা যাবে, তার জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকল্পের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য যাচাই করা সহজ হয়েছে।
বিশ্বের বড় ব্যাংকগুলোও এখন তাদের ঋণ ও বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনা করছে। বিনিয়োগকারীরাও প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত দায়িত্ব, সামাজিক প্রভাব ও সুশাসনকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে বিশ্বব্যাপী সবুজ অর্থায়নের বিস্তার একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছে। কোনো প্রকল্পকে শুধু ‘সবুজ’ নামে চিহ্নিত করলেই সেটি পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। প্রকৃত পরিবেশগত ফলাফল পরিমাপ ও যাচাই করাই এখন বড় বিষয়।
বাংলাদেশে সবুজ ব্যাংকিংয়ের অগ্রযাত্রা: বাংলাদেশে সবুজ ব্যাংকিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ওই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের নিজস্ব কর্মকাণ্ডকে পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক কাঠামো পায়।
পরবর্তী সময়ে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, টেকসই অর্থায়ন এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত আর্থিক ঝুঁকি বিবেচনায় নীতিমালা আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২০ সালের টেকসই অর্থায়ন নীতি এবং পরবর্তী সংশোধিত কাঠামোর মাধ্যমে সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও প্রকল্পে তুলনামূলক সহজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তি, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়োগ্যাস ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্যও দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকিং খাতে টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ মোট বিনিয়োগের প্রায় ৩৯ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়, যেখানে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ শতাংশ। একই সময়ে সবুজ অর্থায়ন মোট মেয়াদি বিনিয়োগের প্রায় ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছায়, যা ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবুজ অর্থায়ন অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ সবুজ ব্যাংকিং এখন আর পরীক্ষামূলক কোনো ধারণা নয়; এটি দেশের মূলধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই সাফল্যের শেষ মানদণ্ড হতে পারে না। অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং সেই অর্থ বাস্তবে কী পরিবর্তন আনছে—এটাই হবে ভবিষ্যতের বড় পরীক্ষা।
সবুজ অর্থায়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে অর্থের গন্তব্যের ওপর। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব ইট, সবুজ ভবন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থায় ব্যাংকিং অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে বাংলাদেশের শিল্প খাতে এর গুরুত্ব অনেক। তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশগত মানদণ্ড ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। ফলে কম পানি ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতারও অংশ।
একটি কারখানা পুরোনো ও অধিক জ্বালানি-ব্যয়ী যন্ত্রপাতির পরিবর্তে আধুনিক শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্র বসাতে চাইলে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাংক যদি দীর্ঘমেয়াদি ও উপযুক্ত অর্থায়ন দেয়, তাহলে উদ্যোক্তার উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমতে পারে। এভাবেই সবুজ অর্থায়ন একই সঙ্গে ব্যবসায়িক দক্ষতা ও পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
পোশাকশিল্পে সবুজ পরিবর্তন: বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সবুজ অর্থায়নের দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যায়। দেশে বিপুলসংখ্যক এলইইডি সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় জ্বালানি ও পানির ব্যবহার কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ এবং শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
এ ধরনের কারখানা গড়ে তুলতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের অর্থায়ন এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে সবুজ অর্থায়ন একদিকে পরিবেশ রক্ষা করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।
জলবায়ু ঝুঁকি এখন ব্যাংকেরও ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি ব্যাংকিং খাতেও পড়ে। বন্যায় কৃষকের ফসল নষ্ট হলে তার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমতে পারে। নদীভাঙনে ব্যবসা বা সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঋণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঘূর্ণিঝড় বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হলে ব্যাংকের বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তাই জলবায়ু ঝুঁকি এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি আর্থিক স্থিতিশীলতারও বিষয়। ভবিষ্যতে ঋণ দেওয়ার সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তার ব্যবসা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই কারণে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু বিষয়ক তথ্য ও পূর্বাভাস আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা জরুরি।
সবুজ অর্থায়নের সুবিধা শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ ব্যবসাগুলোকেও এর আওতায় আনতে হবে। সৌরচালিত সেচ, পানি সাশ্রয়ী কৃষি, জলবায়ু-সহনশীল ফসল, বায়োগ্যাস, জৈব কৃষি, শক্তি-সাশ্রয়ী ক্ষুদ্র শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া যেতে পারে।
অনেক ছোট উদ্যোক্তা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ করতে চান, কিন্তু প্রকল্প তৈরি, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন কিংবা জামানতের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। তাই ব্যাংককে শুধু ঋণদাতা নয়, প্রয়োজন হলে প্রকল্প প্রস্তুতি ও আর্থিক পরিকল্পনার সহযোগী হিসেবেও এগিয়ে আসতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং সবুজ পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল নথির বিস্তারের ফলে কাগজের ব্যবহার কমছে। গ্রাহককে প্রতিটি কাজের জন্য শাখায় যেতে না হওয়ায় সময়, জ্বালানি ও যাতায়াতের ব্যয়ও কমে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংকে সবুজ ব্যাংকিংয়ের সম্পূর্ণ বিকল্প ভাবা যাবে না। ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যাংকের নিজস্ব পরিবেশগত চাপ কমাতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সবুজ ব্যাংকিংয়ের বড় পরীক্ষা হলো ব্যাংক কী ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। ভবিষ্যতে তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রকল্পের জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এতে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও তথ্যনির্ভর হতে পারে।
বড় চ্যালেঞ্জ গ্রিনওয়াশিং। সবুজ অর্থায়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর ঝুঁকিও বাড়ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকৃতপক্ষে পরিবেশবান্ধব না হয়েও প্রচারণার মাধ্যমে নিজেকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। এতে কাগজে-কলমে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ বাড়লেও পরিবেশের বাস্তব উন্নতি হয় না।
তাই শুধু প্রকল্পের নাম বা উদ্যোক্তার দাবি দেখে সবুজ ঋণ দেওয়া উচিত নয়। প্রকল্পের পরিবেশগত ফলাফল পরিমাপের জন্য স্পষ্ট সূচক থাকা দরকার। কত বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে, কত পানি কম ব্যবহার হয়েছে, কত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হয়েছে কিংবা কতটা কার্বন নিঃসরণ কমেছে—এসব তথ্য নিয়মিত পরিমাপ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
সবুজ প্রকল্পের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর বিনিয়োগের সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। অথচ ব্যাংকের অর্থায়ন কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি।
এই ব্যবধান দূর করতে সবুজ বন্ড, টেকসই বন্ড, জলবায়ু তহবিল এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সুযোগ বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করে দীর্ঘমেয়াদি সবুজ প্রকল্পের জন্য বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পথ তৈরি করা প্রয়োজন।একই সঙ্গে উপকূলীয় পরিবেশ, সামুদ্রিক সম্পদ ও টেকসই সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য ভবিষ্যতে নীল অর্থায়নের সুযোগও বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক প্রণোদনা। সবুজ প্রকল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও প্রাথমিক ব্যয় কমাতে কার্যকর প্রণোদনা প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদের ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, কর-সুবিধা এবং ঋণের ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যেসব ব্যাংক প্রকৃত পরিবেশগত ফলাফল অর্জনকারী প্রকল্পে বেশি অর্থায়ন করবে, তাদের জন্য নীতিগতভাবে অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, প্রকল্পের বাস্তব পরিবেশগত ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া সবুজ ব্যাংকিং সফল হবে না। সবুজ অর্থায়নের জন্য দক্ষ ব্যাংকার প্রয়োজন। একটি প্রকল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি, কার্বন নিঃসরণ, জ্বালানি দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সাধারণ ঋণ মূল্যায়নের চেয়ে জটিল। তাই ব্যাংকগুলোতে সবুজ অর্থায়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দল গড়ে তোলা এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। পরিবেশবিদ, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষকদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে প্রকল্প মূল্যায়নের মানও উন্নত হবে।
সবুজ ব্যাংকিং থেকে সবুজ অর্থনীতি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সবুজ ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি শক্তিশালী নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো নীতিকে বাস্তব ও কার্যকর বিনিয়োগে রূপান্তর করা। সবুজ ব্যাংকিংকে শুধু ব্যাংকের একটি আলাদা বিভাগ বা নির্দিষ্ট ঋণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং করপোরেট পরিচালনার সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়কে যুক্ত করতে হবে।
একটি ব্যাংকের সাফল্য শুধু তার মুনাফা, সম্পদ বা ঋণের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা ভবিষ্যতে যথেষ্ট হবে না। সে কতটা দক্ষভাবে অর্থায়ন করেছে, কতটা জলবায়ু ঝুঁকি কমিয়েছে এবং অর্থনীতিকে কতটা পরিবেশবান্ধব করেছে—এসবও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন সবুজ ব্যাংকিং প্রয়োজন কি না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কীভাবে এটিকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে দেশের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা যায়।
সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। নীতিমালা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল যাচাই। সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ এমন জায়গায় পৌঁছানো, যেখানে তা পরিবেশ রক্ষা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুর ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পরিবেশকে উপেক্ষা করে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের অর্থনীতি হতে হবে কম কার্বননির্ভর, সম্পদ-সাশ্রয়ী, জলবায়ু-সহনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।
এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে সবুজ ব্যাংকিং। ব্যাংকের অর্থ যদি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ শিল্প, টেকসই কৃষি, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং জলবায়ু-সহনশীল উদ্যোগের দিকে প্রবাহিত হয়, তবে আজকের বিনিয়োগই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
অতএব সবুজ ব্যাংকিংকে শুধু একটি ব্যাংকিং কৌশল হিসেবে নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে। কারণ অর্থের প্রবাহ যেদিকে যায়, অর্থনীতির ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত সেদিকেই গড়ে ওঠে। আর সেই অর্থের প্রবাহ যদি সবুজ ও টেকসই পথে পরিচালিত করা যায়, তবে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির পাশাপাশি একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশও গড়ে তোলা সম্ভব।

