অর্থঋণ আদালত আইনের আওতায় ব্যাংকের পরিচালিত নিলাম প্রক্রিয়ার বৈধতা সরাসরি রিট করে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনেই যখন বিকল্প প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে, তখন সেই পথ অনুসরণ না করে সংবিধানের রিট এখতিয়ার ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া সম্পত্তির দলিল নিবন্ধন ও নামজারি সম্পন্ন হলে ক্রেতার আইনগত স্বত্ব চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে রিটের মাধ্যমে সেই স্বত্ব বাতিল করা যায় না।
বুধবার প্রকাশিত এ টি এম আশরাফুল ইসলাম হেলাল বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। গত ১৬ জুলাই বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে আদালত বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২(৩) ধারার অধীনে পরিচালিত নিলাম কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সরাসরি রিট আবেদন করার আইনি সুযোগ নেই। এ কারণে এ মামলায় জারি করা রুল এবং দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আদালতের মতে, কোনো সম্পত্তি নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়ার পর ক্রেতার নামে দলিল নিবন্ধন এবং নামজারি সম্পন্ন হলে সেই সম্পত্তির ওপর ক্রেতার চূড়ান্ত আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয়। এরপর নির্ধারিত সময় অতিক্রম করে রিট আবেদন করে নিলাম বাতিল কিংবা সম্পত্তি ফেরত চাওয়ার সুযোগ থাকে না।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রিট আবেদনকারী এ টি এম আশরাফুল ইসলাম হেলাল একটি ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। পরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় সুদসহ বকেয়ার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ৭৪৫ টাকা।
পাওনা আদায়ে ব্যাংক ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এরপর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নিলামে সম্পত্তিটি ৭০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। সর্বোচ্চ দরদাতার অনুকূলে ওই বছরের জুন মাসে বিক্রয় দলিল নিবন্ধন এবং খতিয়ানে নামজারি সম্পন্ন করা হয়।
পরবর্তীতে সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন ঋণগ্রহীতা। প্রাথমিক শুনানির পর আদালত শর্তসাপেক্ষে রুল জারি করেন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর কার্যক্রমের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দেন।
তবে আদালত স্পষ্ট শর্ত দেন যে, রিট আবেদনকারীকে ৯০ দিনের মধ্যে ব্যাংকের পুরো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় রুল এবং স্থগিতাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আবেদনকারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে আদালতের আগের আদেশ অনুযায়ী রুল এবং স্থগিতাদেশ আইনগতভাবে অকার্যকর হয়ে যায়।
রায়ে বলা হয়েছে, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২(৩) এবং ১২(৮) ধারায় নিলামসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। তাই আইন নির্ধারিত বিকল্প প্রতিকার থাকা অবস্থায় সরাসরি রিট গ্রহণযোগ্য নয়।
হাইকোর্ট আরও বলেন, আপিল বিভাগের বিভিন্ন রায়েও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। যেখানে বিকল্প আইনি প্রতিকার বিদ্যমান, সেখানে সাধারণত রিট আদালতের হস্তক্ষেপ উপযুক্ত নয়।
আদালত উল্লেখ করেন, নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পর আইন অনুযায়ী দলিল নিবন্ধন ও নামজারি হয়ে গেলে ক্রেতার অনুকূলে যে আইনগত স্বত্ব সৃষ্টি হয়, তা পরবর্তী সময়ে রিটের মাধ্যমে বাতিল করা সম্ভব নয়। এতে সম্পত্তির মালিকানার স্থায়িত্ব ও আইনগত নিশ্চয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দিয়েছেন। রায়ে বলা হয়েছে, নিলামের অর্থ থেকে ব্যাংকের সব বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের পর যদি কোনো অতিরিক্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তা বিলম্ব না করে রিট আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।
আইনজীবীদের মতে, এ রায় অর্থঋণ আদালতের অধীনে পরিচালিত নিলামসংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা নিলাম প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করতে চান, সেখানে আইন নির্ধারিত প্রতিকার গ্রহণের বিষয়টি এ রায়ের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হলো।
এ রায়ে হাইকোর্ট আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো বিশেষ আইনে যদি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিকল্প প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই আইনসম্মত পথ। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া সরাসরি রিটের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করার সুযোগ নেই।

