ধরেন আপনি জমি কিনবেন, এরপর জমি কিনার সব কাজ শেষ করে ফেললেন যেমন দলিলে স্বাক্ষর, নিবন্ধন ফী পরিশোধ। ভাবলেন আপনার সব সমস্যা শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্ত এরপর শুরু হয় আপনার আসল ঝামেলা। প্রকৃত ভোগান্তি তখনই শুরু হয়, যখন নতুন মালিকের নামে খতিয়ান হালনাগাদ করার পালা আসে। যাকে আমরা নামজারী বলে জানি।
এখানেই যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। দিনের পর দিন, কখনও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। “প্রসেসিং ফি” নামে যা শুরু হয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা বিশাল অংকে গিয়ে ঠেকে। আবার এমনও হয়, সব নিয়ম মেনে সম্পন্ন হওয়া একটি বৈধ লেনদেন কেবল অদৃশ্য কিছু কারণে আটকে থাকে যার কোনো লিখিত ব্যাখ্যা খূজে পাওয়া যায় না।
অর্থনীতির ভাষায়, এটি Transaction Cost বা লেনদেন ব্যয় বলা হয়। কোনো সম্পদের ঘোষিত মূল্যের বাইরেও সেই সম্পদ নিজের নামে আনতে যে অতিরিক্ত সময়, শ্রম, অনিশ্চয়তা ও অর্থ ব্যয় করতে হয়; সেটিই লেনদেন ব্যয়।
বাংলাদেশে জমির মালিকানা অর্জনের প্রকৃত মূল্য সরকারি নির্ধারিত ফি-র চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন মূল্যায়ন বলছে, শুধু দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেই স্ট্যাম্প শুল্ক ও অন্যান্য সরকারি ফি মিলিয়ে সম্পত্তির মূল্যের ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়ে যায়। অথচ এখানেই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়।
নামজারির প্রক্রিয়া সরকারি হিসাবে এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ফাইল হারিয়ে যাওয়া, অকারণ বিলম্ব কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় এই প্রক্রিয়া সপ্তাহ পেরিয়ে মাস পর্যন্ত গড়ায়। এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে সম্পূর্ণ নিবন্ধন ও মালিকানা হালনাগাদের প্রক্রিয়া শেষ হতে বছর লেগে গেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমির মালিক নামজারি সম্পন্ন করতে অনানুষ্ঠানিক বা দালাল টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। একই সঙ্গে গ্রাম অঞ্চলের প্রতি দশটি জমির রেকর্ডের মধ্যে প্রায় ছয়টিতেই প্রকৃত দখলদারের তথ্য প্রতিফলিত হয় না।
একটি নির্ভুল ভূমি রেকর্ড শুধু বর্তমান ক্রেতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ভবিষ্যতে সেই জমির বিপরীতে ঋণ দিতে আগ্রহী ব্যাংক, কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়া পরবর্তী প্রজন্ম সবার জন্যই এর গুরুত্ব সমান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের বর্তমান নামজারি ব্যবস্থায় এই তিনটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি স্পষ্ট। মালিকানা যাচাই ধীরগতির, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনেকাংশেই কর্মকর্তার বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল, আর এই অনিশ্চয়তার প্রভাব বছরের পর বছর ধরে বহাল থাকে।

