রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিকভাবে অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি সাংবিধানিক বিষয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। সরকারের দাবি, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে আরও স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—এমন প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যে কয়েকটি প্রস্তাবের বিপরীতে বিভিন্ন দলের আপত্তি নথিভুক্ত রয়েছে, এটি তার অন্যতম।
অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনের নিয়োগক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট সমর্থন জানিয়েছে। বর্তমানে এসব নিয়োগ রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দিয়ে থাকেন। সংসদীয় সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির আপত্তির বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আরও আলোচনা করা হবে। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতা আরও বিস্তৃত হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়েও নতুন কিছু শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাজা মওকুফ বা হ্রাসের আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মতামত বা সম্মতি নেওয়ার বিধান রাখা হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে সংশোধন আনা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, জুলাই জাতীয় সনদের সুপারিশ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, সংবিধান সংশোধন কমিটি এ বিষয়ে কী ধরনের অবস্থান নেয় এবং প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে কতটা অগ্রসর হয়।
সরকারি দলের হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির অধিকাংশ প্রস্তাবে তাদের আপত্তি নেই। যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো কমিটির আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রতিনিধি ও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য তৈরি হবে। তাঁর ভাষ্য, অতীতে অতিরিক্ত ক্ষমতা এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত থাকায় কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলে সুশাসন, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনে চলতে হয়। সংসদে পাস হওয়া বিল আইনে পরিণত হওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি প্রয়োজন হয়। এছাড়া সংসদ অধিবেশন না থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে তিনি অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতাও রাখেন।
এদিকে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন এই কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি কয়েকটি বিরোধী দল ও একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যকে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিরোধী দলের আরও সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে কমিটির সদস্যসংখ্যা ১৭-তে উন্নীত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি এখন পর্যন্ত কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়নি।

