বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় প্রতিটি জেলায় আমার একটি অভ্যাস ছিল—সুযোগ পেলেই জেলা কারাগার পরিদর্শনে যাওয়া। এটি কখনোই শুধুমাত্র দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেখিনি; বরং বিচারব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বোঝার একটি মানবিক প্রয়াস হিসেবে নিয়েছি।
কারাগার আমার কাছে শুধু অপরাধীদের বন্দিশালা নয়, বরং একটি সমাজের বিচারব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। সেখানে গেলে বোঝা যায়, কোথায় ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে, কোথায় মানুষের অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে, আর কোথায় ন্যায়বিচারের পথে বাধা তৈরি হচ্ছে।
রাঙামাটি জেলায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত কারাগার পরিদর্শন করতাম। প্রায় তিন মাস পরপর কারাগারে গিয়ে আমার মূল লক্ষ্য থাকত—কোনো ব্যক্তি যেন বিনা বিচারে দীর্ঘদিন বন্দি না থাকেন এবং প্রত্যেক বন্দি যেন প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান।
এই কাজে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সহযোগিতা পেয়েছি। বিশেষ করে কারা কর্তৃপক্ষ ও জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতা সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে মাঝে মাঝে সংবাদমাধ্যমে যখন দেখি—‘বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাবন্দি’—তখন বিষয়টি গভীরভাবে ব্যথিত করে। কারণ এটি শুধু একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ নয়; বরং পুরো বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় প্রশ্ন। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত নয়।
আনন্দের বিষয় হলো, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলার লিগ্যাল এইড কর্মকর্তারা আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। পাশাপাশি জেলা ও দায়রা জজদের নেতৃত্বে নিয়মিত কারাগার পরিদর্শনের একটি ইতিবাচক চর্চাও তৈরি হয়েছে।
তবে আমার বিচারিক জীবনের অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি ঘটনা আজও গভীরভাবে মনে গেঁথে আছে। এমন একটি মুহূর্ত, যা একজন বিচারক হিসেবে আমার চিন্তাভাবনাকে বদলে দিয়েছে।
ঘটনাটি ২০২০ সালের। বিচারক হিসেবে ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে আমরা একবার সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে যাই। কারাগার পরিদর্শনের এক পর্যায়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত কনডেম সেলের কাছাকাছি।
হঠাৎ মনে হলো, এই মানুষগুলোর কথাও শোনা দরকার। কৌতূহল ও মানবিক তাগিদ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষীকে বললাম, সম্ভব হলে একজন বা দুজন বন্দির সঙ্গে কথা বলতে চাই।
কারারক্ষী বললেন, “স্যার, আপনারা বিচারক। চাইলে কথা বলতে পারেন।”
কিছুক্ষণ পর কনডেম সেলের ভেতর থেকে এক তরুণ এগিয়ে এলেন। বয়স আনুমানিক ২৮ থেকে ৩০ বছর। তার মুখে ছিল এক ধরনের স্থিরতা, কিন্তু চোখে স্পষ্ট ছিল দীর্ঘ যন্ত্রণা ও অজানা কষ্টের ছাপ।
তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন—
- “স্যার, একটা অনুরোধ করব।”
- আমি বললাম, “বলুন।”
- তিনি কিছুক্ষণ থেমে বললেন— “দয়া করে কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসি দেবেন না।”
কথাটি ছিল খুব ছোট, কিন্তু এর গভীরতা ছিল অপরিসীম।
এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। বিচারক হিসেবে বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেছি, অসংখ্য মামলা শুনেছি, কারাগার পরিদর্শন করেছি। কিন্তু সেই তরুণের কথাটি আজও আমার মনে বাজে।
যখন এজলাসে বসি, যখন কোনো মামলার রায় নিয়ে ভাবি, কিংবা কারাগারে যাই—তখন মনে হয়, সেই মানুষটি যেন আবার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলছে—
- “স্যার, কাউকে খুশি করার জন্য শাস্তি দেবেন না।”
এই একটি বাক্য আমার পেশাগত জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা হয়ে আছে। বিচারকের আসন শুধু আইন প্রয়োগের জায়গা নয়; এটি মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ ও ভাগ্য নির্ধারণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিচার কেবল আইনের ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি রায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের জীবন, তার পরিবারের স্বপ্ন এবং তার শেষ ভরসা।
সমাজ যাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, তাদের মধ্যেও কখনো কখনো এমন মানবিক আবেদন থাকে, যা ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ মনে করিয়ে দেয়।
সেই তরুণের একটি বাক্য আমাকে শিখিয়েছে—একজন বিচারককে সবসময় আইন, ন্যায় ও বিবেকের সমন্বয়ে চলতে হয়। কোনো চাপ, আবেগ, প্রতিশোধ কিংবা কাউকে সন্তুষ্ট করার আকাঙ্ক্ষা যেন বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে।
এই উপলব্ধিই আমাকে বারবার কারাগারে নিয়ে যায়। মানুষকে কাছ থেকে দেখতে, বিচার ব্যবস্থার বাস্তবতা বুঝতে এবং নিজেকেই প্রশ্ন করতে—আমি কি সত্যিই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছি?
- মোহাম্মদ জুনায়েদ
জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা, সুনামগঞ্জ

