একটি দুর্ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল পর্যটকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনার পর শুধু ওই ঘটনার তদন্ত নয়, পুরো ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ এবং নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিশাত ফারজানা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিশটি পাঠান। এতে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নোটিশের পেছনে রয়েছে গত ১ আগস্ট কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার দরিয়ানগর সৈকতে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা। ওই দিন প্যারাসেইলিং করার সময় ছিটকে পড়ে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না।
একটি দুর্ঘটনার বাইরে যে প্রশ্ন
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, এই মৃত্যু শুধু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সেই দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তার দায়ও সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজারে সমুদ্রভিত্তিক বিনোদনের পরিধি দ্রুত বেড়েছে। প্যারাসেইলিং, জেটস্কি, স্পিডবোটসহ নানা ধরনের রোমাঞ্চকর কার্যক্রম পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম পরিচালনায় নিরাপত্তার মান, প্রশিক্ষিত কর্মী, যন্ত্রপাতির নিয়মিত পরীক্ষা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না।
নিরাপত্তা কাঠামোর দাবি
নোটিশে শুধু প্যারাসেইলিং বন্ধের দাবি জানানো হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, রোমাঞ্চভিত্তিক পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনায় একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কী শর্তে সেবা দেবে, সরঞ্জামের মান কীভাবে যাচাই হবে, কর্মীদের প্রশিক্ষণের মানদণ্ড কী হবে এবং দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার তা নিয়ে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
পর্যটন শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে রোমাঞ্চভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা আরও বাড়বে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে পর্যটকদের আস্থা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের পর্যটন শিল্পের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় এখানে পরিচালিত প্রতিটি কার্যক্রমের নিরাপত্তা মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন নজর কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপে
আইনি নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের পথও উন্মুক্ত থাকতে পারে।
একজন পর্যটকের মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। একই সঙ্গে এটি একটি বড় সতর্কবার্তাও। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে রোমাঞ্চভিত্তিক পর্যটন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। তাই এখন শুধু একটি ঘটনার তদন্ত নয়, পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

