বাংলাদেশে থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নিছক একটি কাগুজে নথি নয়—বহু ক্ষেত্রে এটিই একজন সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম আইনি অবলম্বন। প্রাণনাশের হুমকি, আক্রমণের আশঙ্কা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনায় মানুষ ভবিষ্যৎ বিপদ এড়াতে থানার দ্বারস্থ হন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যাশিত সেই সুরক্ষা অনেক সময়ই যথাসময়ে পাওয়া যায় না।
এর একটি বড় কারণ লুকিয়ে আছে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে। অ-আমলযোগ্য অপরাধ সংক্রান্ত জিডির তদন্ত শুরু করার আগে পুলিশকে অবশ্যই আদালতের অনুমতি নিতে হয়। প্রশ্ন হলো, বর্তমান বাস্তবতায় এই নিয়ম কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে? বিচারিক নজরদারি বজায় রেখেও কি নাগরিককে দ্রুত ও কার্যকর সেবা দেওয়ার কোনো বিকল্প পথ নেই?
ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধিতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এতে বলা আছে, থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে কোনো অ-আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ এলে তা যথাযথভাবে নথিভুক্ত করে অভিযোগকারীকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে হবে। এখানেই মূল জটিলতা—প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সুনির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এ ধরনের মামলার তদন্ত শুরু করতে পারেন না। অর্থাৎ থানায় অভিযোগ জমা পড়লেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে না; আদালতের সবুজ সংকেতই তদন্তের পূর্বশর্ত। আদালতের অনুমতি মিললেও তদন্তকারী কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেন না। তবে একই আইনে আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশকে আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই তদন্ত শুরুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
আইনপ্রণেতারা মূলত বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় পুলিশি হস্তক্ষেপ সীমিত রাখার লক্ষ্যেই এই বিধান রেখেছিলেন, যার যৌক্তিকতা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে যেকোনো আইনকে নীতিগতভাবে সঠিক হলেই চলে না, বাস্তবেও তা নাগরিকের জন্য কার্যকর হতে হয়। আর এখানেই বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, থানায় জিডি করার পর বিপুলসংখ্যক অভিযোগকারী পরবর্তীতে আদালতে হাজির হন না। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ—কেউ জানেনই না যে তদন্ত শুরুর জন্য তাকে আদালতে যেতে হবে, কেউ আর্থিক সংকটে পড়েন, কেউ কর্মব্যস্ততার কারণে সময় বের করতে পারেন না, আবার কারও ক্ষেত্রে ভয় বা অনাগ্রহও কাজ করে। থানা থেকে সমন পাঠানো বা মৌখিকভাবে জানানো সত্ত্বেও নির্ধারিত দিনে অনেকে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি মেলে না, ফলে পুলিশও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তদন্তে হাত দিতে পারে না।
এখানেই তৈরি হয় একটি বাস্তব বৈপরীত্য। একদিকে একজন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় গিয়েছেন, অন্যদিকে প্রক্রিয়াগত একটি শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেই আবেদন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। অভিযোগকারীর ধারণা হয়, পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, আর পুলিশের অবস্থান হলো আদালতের অনুমতি ছাড়া তাদের কিছুই করার নেই। ফলে যে বিধান নাগরিকের সুরক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে সেটিই অনেক সময় নাগরিককে প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত করছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন তারাই, যারা প্রাণনাশের হুমকি, আক্রমণের আশঙ্কা বা গুরুতর ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ নিয়ে থানায় যান।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, একই আইনি কাঠামোর মধ্যেও ভিন্ন চিত্র দেখা যায় নিখোঁজ ব্যক্তির জিডির ক্ষেত্রে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত আদালতের অনুমতির অপেক্ষা না করেই তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করে দেয়, কারণ সেখানে প্রতিটি মুহূর্তের গুরুত্ব অপরিসীম—বিলম্ব হলে একজন মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। একই যুক্তি প্রাণনাশের হুমকি বা সহিংসতার আশঙ্কাসংক্রান্ত জিডির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগ পাওয়ামাত্র পুলিশ যদি প্রাথমিক অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারত, তাহলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। এই আলোচনার লক্ষ্য কোনোভাবেই আদালতের ক্ষমতা বা বিচারিক তদারকির গুরুত্ব খাটো করা নয়। বরং প্রকৃত প্রশ্ন হলো—তদন্ত শুরুর আগেই আদালতের পূর্বানুমতি অপরিহার্য হওয়া উচিত, নাকি তদন্ত শেষে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের মাধ্যমে বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করাই অধিকতর কার্যকর সমাধান হতে পারে।
বিচারিক তদারকি অবশ্যই অক্ষুণ্ণ থাকা প্রয়োজন, তবে তা এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত যাতে নাগরিক দ্রুত সেবা থেকে বঞ্চিত না হন। বিশেষত প্রাণনাশের হুমকি, আক্রমণের আশঙ্কা, গুরুতর ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নির্দিষ্ট শ্রেণির জিডির ক্ষেত্রে আইনি সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশকে আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই সীমিত পরিসরে প্রাথমিক তদন্ত শুরুর ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে, শর্ত থাকবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল বাধ্যতামূলক করা। এতে একদিকে বিচারিক তদারকি অক্ষুণ্ণ থাকবে, অন্যদিকে তদন্তও অহেতুক বিলম্বিত হবে না।
সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাও ক্রমাগত রূপান্তরিত হচ্ছে। অপরাধের ধরন পাল্টেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, নাগরিকের প্রত্যাশাও আগের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বহু বছর আগে প্রণীত আইনের কিছু বিধান বর্তমান প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব বলেই মনে করা হয়। আইন কখনো স্থবির থাকতে পারে না; সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনেরও ক্রমাগত পরিমার্জন প্রয়োজন।
এ ধরনের মূল্যায়নে কেবল আইনবিদ বা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, কারণ তারাই প্রতিদিন নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ করেন এবং বিদ্যমান আইনি সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মতামতও এই আলোচনায় সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কার্যকর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার নিশ্চিত করা নয়, বরং সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধ করাও। জিডি সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় যদি সেই হাতিয়ারই তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে গোটা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধানের বর্তমান প্রয়োগ—বিশেষত প্রাণনাশের হুমকি ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত জিডির ক্ষেত্রে—নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, নাগরিকের প্রত্যাশা এবং বিচারিক তদারকির মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। শেষ পর্যন্ত আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচারকে মানুষের কাছে আরও দ্রুত, সহজলভ্য ও কার্যকর করে তোলা—আর সেই লক্ষ্যেই জিডি তদন্তে আদালতের পূর্বানুমতি সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধান নিয়ে একটি গভীর ও দায়িত্বশীল জাতীয় আলোচনা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

